জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সারাদেশে ৩০০ সংসদীয় আসনে জমা পড়েছে ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৪২টি বৈধ ঘোষিত হয়েছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন ত্রুটি ও আইনি জটিলতায় বাতিল করা হয়েছে ৭২৩ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র, যা মোট প্রার্থীর প্রায় ২৮ শতাংশ।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, বড় দলগুলোর মধ্যে জাতীয় পার্টির ৫৯ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ৩৯ এবং বিএনপি ও সিপিবির ২৫ জন করে প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর ১০ জন ও এনসিপির তিন প্রার্থীর আবেদন বাতিল করা হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে বাতিলের সংখ্যা সবচেয়ে
যাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে, তারা ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ইসিতে আপিল করতে পারবেন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অঞ্চলভিত্তিক বুথে এই আবেদন গ্রহণ করা হবে। আপিল নিষ্পত্তি হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারি এবং প্রতীক বরাদ্দ ২১ জানুয়ারি।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের শেষ দিনে কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনে জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব (বর্তমান আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন জাপার নির্বাহী চেয়ারম্যান) মুজিবুল হক চুন্নুর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। বেশ কিছু জেলায় বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
শেষ দিনে জামায়াতের তিনজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তাদের মধ্যে কুড়িগ্রাম-৩ আসনের প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে দ্বৈত নাগরিকত্ব জটিলতায়। এই খবরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা। আর নেত্রকোনা-৫ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাসুম মোস্তফার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে একটি মামলার তথ্য গোপন করে নিজেকে খালাস দেখানোর কারণে। দ্বৈত নাগরিকত্ব জটিলতায় গতকাল চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরের ১৬টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে ১৪৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। তবে বাছাই শেষে বাতিল হয়েছে ৪২ জনের মনোনয়নপত্র; প্রার্থিতা টিকেছে ১০১ জনের। গতকাল চট্টগ্রামে সাতটি আসনে ১৬ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।
ফরিদপুর-১ আসনের ১৫ প্রার্থীর মধ্যে আটজনের মনোনয়নপত্র প্রথমে স্থগিত করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সংশোধনী জমা দিতে সক্ষম হওয়ার তাদের মধ্যে সাতজনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
দ্বৈত নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত কারণে সিলেটের তিনটি আসনের তিন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র এর আগে স্থগিত করা হয়েছিল। বিষয়টি খতিয়ে দেখার পর গতকাল শেষ দিনে তাদের মধ্যে দুজনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। তারা হলেন সিলেট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী এম এ মালিক ও সিলেট-৬ আসনে গণঅধিকার পরিষদের জাহিদুর রহমান। তবে সিলেট-১ আসনে এনসিপির প্রার্থী এহতেশামুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার (২ জানুয়ারি) বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। তবে ঢাকা-১৮ আসনে তার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষিত হয়েছে। ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র শনিবার (৩ জানুয়ারি) বাতিল হয়। কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয় গত শুক্রবার। রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূমের মনোনয়নপত্র বাতিল হয় শনিবার (কিশোরগঞ্জ-৫)। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) অনেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে দলের নতুন নেতৃত্ব-সংক্রান্ত তথ্য নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থায় হালনাগাদ না হওয়ায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯ ডিসেম্বর ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন।
ইসি জানিয়েছে, সারা দেশে ৩০০ আসনে ৩ হাজার ৪০৬টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে জমা পড়েছিল দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র। এর মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ২ হাজার ৯০ প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। বাকি ৪৭৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী।
মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে আপিলগুলো ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে নিষ্পত্তি করবে ইসি। প্রার্থিতা প্রত্যাহার করার শেষ সময় ২০ জানুয়ারি। এরপর চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা জানা যাবে। ২১ জানুয়ারি প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ করবেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। এর পর থেকে শুরু হবে নির্বাচনী প্রচার। ভোট গ্রহণ হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। একই দিন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটও হবে।
বর্তমানে ইসিতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আছে ৬০টি। এর মধ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত আছে। এর বাইরে নিবন্ধিত আটটি দল নির্বাচনে কোনো প্রার্থী দেয়নি। এসব দল হলো—বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, তরীকত ফেডারেশন, তৃণমূল বিএনপি ও বাংলাদেশ জাতীয়বাদী আন্দোলন (বিএনএম)।