সুনামগঞ্জের ছাতকে জনতার হাতে আটক আওয়ামী লীগ নেতা হাজী স্বপন মিয়াকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাতে ছাতক পৌর শহরের তাহির প্লাজার সামনে স্থানীয় জনতা হাজী স্বপন মিয়াকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন বলে জানা গেছে। পরে পুলিশ হেফাজতে তাকে চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেখান থেকেই রাতের কোনো এক সময় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
হাজী স্বপন মিয়া দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের সারপিন নগর গ্রামের মৃত আব্দুল মান্নানের ছেলে। বর্তমানে তিনি ছাতক পৌর শহরের মন্ডলীভোগ এলাকায় বসবাস করেন।
তবে হাজী স্বপনকে ঘিরে অভিযোগ ও পুলিশের অনুসন্ধানের বিষয়টি নতুন নয়। বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টারে তার বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। ওই অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের নির্দেশে ছাতক সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পুলিশের নথি অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের স্মারক নং—অপঃ/২৫/৩১৬৫/ভি, তারিখ ৫ অক্টোবর ২০২৫-এর সূত্রে অভিযোগটি অনুসন্ধানের জন্য ছাতক সার্কেল কার্যালয়ে পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ছাতক সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ৭২ নম্বর স্মারক জারি করা হয়।
ওই স্মারকে অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য সংশ্লিষ্ট অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত হাজী স্বপন মিয়াকে ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ সকাল ১১টায় ছাতক সার্কেল কার্যালয়ে উপস্থিত থাকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ছাতক থানার ওসিকে অনুরোধ করা হয়। নথিতে হাজী স্বপনের পরিচয় হিসেবে পিতা মৃত আব্দুল মান্নান, গ্রাম—সারপিন নগর (বর্তমানে মন্ডলীভোগ), থানা—ছাতক, জেলা—সুনামগঞ্জ উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ, হাজী স্বপনের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের বিষয়ে পুলিশি অনুসন্ধান প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল এবং নির্ধারিত তারিখে তাকে হাজির করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল। তবে ওই অনুসন্ধানের পর অভিযোগের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা অভিযোগ করেছেন, হাজী স্বপনের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, বিভিন্ন মহলে তার প্রভাব রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক বাকী বিল্লাহ অভিযোগ করেন, ‘মোটা অঙ্কের রফা-দফার মাধ্যমে’ হাজী স্বপনকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ছাতক পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জসিম উদ্দিন সুমেন অভিযোগ করেন, হাজী স্বপনের মাধ্যমে থানার ওসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের ‘লক্ষ-লক্ষ টাকার অবৈধ আয়’ হয়। তার দাবি, জনতা স্বপনকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করলেও অর্থের বিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ছাতক পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য তানিমুল ইসলাম তানিম, যুবদল নেতা আব্দুল মোমেন মামনুন, নোমান ইমদাদ কাননসহ কয়েকজন নেতাও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, হাজী স্বপনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, হাজী স্বপন বিভিন্ন ব্যবসার পাশাপাশি সরকারি উন্নয়নকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সরকারি কোটি টাকার বিভিন্ন কাজের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নিয়েও এলাকায় আলোচনা রয়েছে। এসব কাজের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তবে হাজী স্বপনকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ছাতক থানার পুলিশের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে ঘুষ, আর্থিক লেনদেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবসহ অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে ওসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ও হাজী স্বপন মিয়ার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
এদিকে হাজী স্বপনকে পুলিশ হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়া এবং পুলিশের ভূমিকার প্রতিবাদে সোমবার সন্ধ্যায় ছাতক শহরে বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আয়োজকদের দাবি, সাধারণ মানুষের ব্যানারে আয়োজিত ওই কর্মসূচি থেকে ওসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের প্রত্যাহারের দাবি জানানো হবে।