বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৩ অপরাহ্ন

গৌরীর মন পেতে মহানায়কের যত কাণ্ড

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান রোমান্টিক নায়ক উত্তম কুমার। পর্দায় অসংখ্য নায়িকার সঙ্গে জুটি বেঁধে উপহার দিয়েছেন প্রেমাখ্যান। তার প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া নারীর সংখ্যা কম নয়। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে গৌরী চ্যাটার্জির প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন উত্তম। তারকা হওয়ার আগেই এই প্রেমের সূচনা। এ ক্ষেত্রে উত্তম ব্যর্থ প্রেমিক নন, বরং প্রিয় মানুষটিকে নিজের করেই পেয়েছিলেন। তবে গৌরীকে পেতে পাগলামিও কম করেননি। চলুন, স্মৃতির পাতা উল্টে ফিরে যাই গত শতকের চল্লিশের দশকে—

উত্তম কুমার তখনো অভিনেতা নন। জীবনের প্রথম চাকরি পোর্ট কমিশনার্স অফিসের ক্যাশ ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন। সময়মতো অফিসে যান আর ছুটি হলে বাড়ি ফিরে বিশ্রাম নেন। বাকিটা সময় অভিনয়ের স্বপ্নে বিভোর থাকেন। একদিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরে বিশ্রাম নিচ্ছেন। হঠাৎ তার চোখ পড়ে বাড়ির সদর দরজায়। তার জ্যাঠাতো বোন অন্নপূর্ণার সঙ্গে একজন মেয়েকে দেখতে পান উত্তম। মেয়েটি দেখতে সুশ্রী। তবে তার মুখের হাসি অধিক মিষ্টি। মেয়েটিকে দেখে মুগ্ধ হন উত্তম। বলা যায়—লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট!

সুশ্রী মেয়েটিকে দেখার পর কেটে যায় কয়েক দিন। কিন্তু কোনোভাবেই মেয়েটির মুখ ভুলতে পারেন না। মেয়েটি যদি আবার তাদের বাড়িতে আসে—এই আশায় অফিস ছুটি হলে দ্রুত বাড়ি ফিরে অপেক্ষা করতে শুরু করেন উত্তম। আশা পূর্ণ করতে সত্যি সত্যি মেয়েটি তাদের বাড়িতে আসে। পূর্বের মতো এবারো সুশ্রী মেয়েটির সঙ্গে অন্নপূর্ণা। প্রিয় মানুষটির সঙ্গে কথা বলার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেন!

উত্তম নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে জ্যাঠাতো বোন অন্নপূর্ণাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন—“ তোকে কে পৌঁছে দিয়ে গেল রে?” দুষ্টুমির ছলে তার বোন পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, “কে বল দিকিনি?” উত্তম বললেন, “ওই যে এক্ষুনি এসেছিল তোর সঙ্গে?” অন্নপূর্ণা বলেন, “ও তো গৌরী…গৌরী রানী গাঙ্গুলি। অ্যার্স্টন আর ল্যঅন্সডাউন রোডের মুখে থাকে।” গৌরীর বাড়ির ঠিকানা শুনে কিছুটা দমে যান উত্তম। কারণ গৌরী যে অভিজাত পরিবারের কন্যা তা বুঝতে অসুবিধা হয় না তার। নিজে নিজে সমীকরণ মিলিয়ে উত্তম ভাবলেন—গৌরীর সঙ্গে কোনো কিছু হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু প্রেমিক মন কি এসব বাধা মানে!

 

পরে বোন অন্নপূর্ণার কাছে উত্তম কুমার জানতে পারেন—একটি গানের স্কুলে গৌরীর সঙ্গে তার পরিচয়। গৌরী গান খুব ভালোবাসেন। আরেক দিন গৌরী তাদের বাড়ি আসেন। সময় নষ্ট না করে দ্রুত হারমোনিয়াম নিয়ে বসে পড়েন উত্তম কুমার। তার উদ্দেশ্য গৌরীকে গান শোনানো। ব্যাকুল হৃদয়ে গলা ছেড়ে গাইলেন তিনি। কিন্তু গৌরী তার কাছে এলেন না। বরং কথা শেষ করে চলে গেলেন। একই সঙ্গে হতাশ ও মনে কষ্ট পেলেন উত্তম কুমার। খানিকটা সময় পর অন্নপূর্ণা তার কাছে গেলেন। রাগী স্বরে উত্তম প্রশ্ন করলেন—“কী চাই?” জবাবে অন্নপূর্ণা বলেন, “গৌরী বলল, ‘তোর দাদার গানের গলাটা তো বেশ।’ ও তোমার সঙ্গে দেখা করবে, আলাপ করবে বলেছে।” এ কথা শুনে উত্তমের হৃদয়ে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়।

কবে আসবেন গৌরী—তার প্রতীক্ষায় উত্তম কুমার। এভাবে কিছুদিন কেটে গেল, তবু অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো না। বরং ধনীর দুলালি গৌরীকে না পাওয়ার অনিশ্চয়তা তাকে অক্টোপাসের মতো ঘিরে ধরে। ভুলে যেতে চেয়েও তা পারছিলেন। পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকেন। একপর্যায়ে গৌরীর সঙ্গে দেখা করার জন্য তার স্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়ান; তাতে-ও লাভ হলো না। কারণ গৌরীকে তাদের দারোয়ান স্কুলে পৌঁছে দিতেন, তাই কথা বলতে পারেননি। ছুটির পর কথা বলার সুযোগ মিলতে পারে—এই আশায় গৌরীর বাড়ি ফেরার পথে গিয়ে দাঁড়ান। কিন্তু তখনো দারোয়ানকে সঙ্গে দেখে হতাশ হন উত্তম। তবে গৌরী তাকে আশাহত করেননি। দারোয়ানকে ফাঁকি দিয়ে গৌরী বলেন—“তুমি বাড়ি যাও, আমি দেখা করব তোমাদের বাড়িতে।” এভাবেই উত্তম-গৌরীর মন দেওয়া–নেওয়া শুরু।

ভাগ্য যখন সুপ্রসন্ন হয়, তখন সবদিক থেকেই হয়। উত্তম কুমারের ক্ষেত্রেও তেমনটাই দেখা যায়। কারণ সেই সময়ে সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। একদিকে প্রেমের ভাগ্য খুলল, ঠিক সেই সময়ে সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগও পেয়ে যান উত্তম কুমার। আর খবরটি প্রথমে তার মাকে জানান উত্তম, তারপর ছুটে যান গৌরীর কাছে। উত্তম বলেন, “আমি সিনেমায় নামছি, তোমার মত কী গৌরী?” জবাবে তিনি বলেন, “বেশ তো, এতে আমার আবার মতামত কী?” সুযোগ বুঝে উত্তম কুমার তার মনে লুকানো কথাটি ঝটপট বলে ফেলেন। তিনি বলেন, “গৌরী, বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে ভালোবাসি। আর ভালোবাসি বলেই তোমার মতামত আমার একান্ত দরকার।” এসব কথা শুনে হাসতে হাসতেই গৌরী বলেন, “তুমি সিনেমায় নামলে আমি খুশি হব বেশি।”গৌরীর সঙ্গে উত্তম কুমারের প্রেম চলতে থাকে। এরই মধ্যে উত্তম অভিনীত ‘দৃষ্টিদান’ সিনেমা মুক্তি পায়। উত্তমের সঙ্গে সিনেমাটি দেখার ইচ্ছে ছিল গৌরীর। কিন্তু তা হয়নি। পরে দাদির সঙ্গে হলে গিয়ে সিনেমাটি দেখেন। হলে বসেই কথার ছলে উত্তমকে পছন্দ করার কথাটি দাদিকে বলে দেন গৌরী। প্রেমের খবর বাড়িতে জানার পর অন্যত্র গৌরীর বিয়ে ঠিক করেন। আর বাড়ি থেকে বের বেরোনোর উপরে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এভাবে কেটে যায় কয়েক বছর। একদিকে গৌরীর জন্য বেদনা, অন্যদিকে একের পর এক সিনেমা ফ্লপ হওয়ার হতাশা; মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন উত্তম কুমার। গৌরীও ভালোবাসার মানুষকে হারাতে নারাজ। একদিন উত্তমের বাড়িতে ছুটে আসেন গৌরী। নানা ভাবনাচিন্তার পর গৌরীর হাত ধরে তাদের বাড়ি যান এবং গৌরীর বাবার সামনে দাঁড়ান। অনেক বাগবিতণ্ডার পর ভদ্রলোক রাজি হন। আর স্বপ্ন সত্যি হয়ে ধরা দেয়। পরিণয় পায় তাদের ভালোবাসা!

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102