বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০১:০৬ পূর্বাহ্ন

মমতাকে তৃণমূল থেকে ‘অপসারণ’ করলেন বিদ্রোহীরা

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬

সোমবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যেপাধ্যায়কে দল থেকে অপসারণ করে নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করেছে বিধায়ক অরূপ রায় এবং বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবির। এ দিন বিকেলে রাজধানী কলকতার নিউটাউন এলাকার এক অভিজাত হোটেলে এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেণ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।

সোমবার বিধানসভায় বাজেট অধিবেশন ছিল। সেই অধিবেশন শেষে তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়কেরা নিউ টাউনের সেই হোটেলে বৈঠকে বসেন। বৈঠকে ছিলেন তৃণমূলের ৬০ জন বিধায়ক। এ ছাড়াও, কলকাতার প্রায় ৭০ জন প্রাক্তন কাউন্সিলর উপস্থিত ছিলেন ওই বৈঠকে। ওই বৈঠকেই ‘তৃণমূলের’ ৩০ জনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা করা হয়।

নতুন কমিটিতে দলের নতুন চেয়ারম্যান করা হয়েছে অরূপ রায়কে; সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যপর্যায়ে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে মোট ৩ জনকে—জাভেদ খান (সাধারণ সম্পাদক ১), সন্দীপন সাহা (সাধারণ সম্পাদক ২), সাবিনা ইয়াসমিন (সাধারণ সম্পাদক ৩)।

নতুন কমিটির প্রথম সহ-সভাপতি (সহ-সভাপতি ১) হয়েছেন  রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। সহ-সভাপতি ২ এবং সহ-সভাপতি ৩ করা হয়েছে যথাক্রমে কলকাতার সাবেক মেয়র এবং মমতার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রীসভার নগর ও পুরসভামন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম ববি এবং জ্যেষ্ঠ বিধায়ক রথীন ঘোষকে। কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে আখরুজ্জামানকে।

উল্লেখ্য, সোমবার বিদ্রোহীদের বৈঠকে যে ব্যানার টাঙানো হয়েছিল তাতে মমতার ছবি ছিল না। মহাত্মা গান্ধী, বিআর আম্বেদকর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলামের ছবি ছিল।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ‍ঋতব্রত বলেন, “তৃণমূলের দলীয় সংবিধানের ২০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে,  প্রতি তিন বছর পর পর জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক (কাউন্সিল) হবে; কিন্তু ২০২২ সালের পর আর তৃণমূলের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক হয়নি। সেই কারণে প্রস্তাব এনে আগের কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে।”

নিউ টাউনের বৈঠক শেষ হওয়ার পরই পদক্ষেপ নিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস (কালীঘাট তৃণমূল)। ফিরহাদ, জাভেদ, দুই অরূপ, রথীন, সাবিনা, স্নেহাশিস চক্রবর্তী, বিপ্লব মিত্রদের শো কজ় নোটিস ধরানো হয়েছে। দল বিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে তাদের কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরে বিদ্রোহের ফুলকি দেখা যায়। সেই ফুলকি ধীরে ধীরে বড়সড় আগুনের চেহারা নেয়। একে একে বিধায়কেরা বিদ্রোহ শুরু করেন।

বিদ্রোহের সূত্রপাত সইকাণ্ডকে কেন্দ্র করে। বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা, উপ-দলনেতা এবং মুখ্যসচেতক কে হবেন, এ নিয়ে পরিষদীয় নিয়মের জটিলতায় পড়তে হয়েছিল। অভিযোগ ওঠে, অভিষেক বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুর কাছে তৃণমূল বিধায়কদের সই করা প্রস্তাবিত চিঠি পাঠান, তাতে কয়েক জন বিধায়কের সই ‘জাল’ করা হয়।

সেই অভিযোগ প্রথম প্রকাশ্যে আনেন উলুবেড়িয়া উত্তরের বিধায়ক ঋতব্রত এবং এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন। সেই নিয়ে টালবাহানা চলে বেশ কয়েক দিন। দলের মধ্যে ভাঙন ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে। তৃণমূলের রাশ আলগা হতে থাকে মমতার হাত থেকে। প্রথম পর্যায়ে একসঙ্গে ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থনে ঋতব্রতকে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা করা হয়।

সেই শুরু তৃণমূলে ভাঙন। পরে একে একে ফিরহাদদের মতো মমতা-ঘনিষ্ঠেরাও বিদ্রোহ শিবিরে নাম লেখাতে শুরু করেন। শুধু তৃণমূলের পরিষদীয় দলে নয়, ভাঙন ধরে সংসদীয় দলেও। একসঙ্গে লোকসভার ২০ জন সাংসদ তৃণমূল ছাড়েন। ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া নামে এক রাজনৈতিক দলের হাত ধরেন তাঁরা। সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেবেরা রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেন।

শুধু উঁচুতলায় নয়, তৃণমূলের নিচুতলার সংগঠনেও ভাঙন ধরতে থাকে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূল ছাড়ার হিড়িক পড়ে যায়। প্রশ্ন উঠতে থাকে, আসল তৃণমূল কোনটা? মমতার হাতে যে তৃণমূল আছে না কি ঋতব্রতের শিবির? সোমবারের বৈঠকে ঋতব্রতেরা স্পষ্ট দাবি করেছেন, তাঁরাই আসল আসল তৃণমূল। সেই বৈঠকে যোগ দিতে দেখা যায় মমতার তৈরি করে দেওয়া তৃণমূলের নতুন কমিটির রাজ্য সভাপতি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পুত্র সৌরভ বসুকেও। তিনি কলকাতা পুরসভার ৮৬ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর ছিলেন।

যদিও সোমবারের বৈঠককে গুরুত্ব দিতে নারাজ বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ। মমতার কালীঘাটের বাড়ি থেকে বৈঠক সেরে বেরিয়ে তিনি বলেন, “তৃণমূল আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমার্থক। আমাদের দলের যা কাঠামো, তাতে এসব করার এক্তিয়ার ওদের (বিদ্রোহী) নেই।’’

এ প্রসঙ্গে তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, “পরিষদীয় দল আর পার্টি সংগঠন এক বিষয় নয়। এটা নিয়ে যা বলার আদালত বলবে। ঋতব্রতদের এত দিন বিশ্বাসঘাতক বলছিলাম। আজ বলছি ফোর টোয়েন্টি।’’ শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণের আরও সংযোজন, ‘‘সিপিএমের সংস্কৃতিই ছিল খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি। ও (ঋতব্রত) সেই সিপিএমের প্রোডাক্ট। ফলে এর থেকে বেশি আর কী হবে।”

সিপিএমের আইনজীবী নেতা সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় বলেছেন ‘‘ঋতব্রতেরা যে ভাবে এগোচ্ছেন তাতে স্পষ্ট একটি নকশা রয়েছে। অনেক সময় অনেক কোম্পানি লাটে উঠে যায়। তখন দেখা যায়, সেই কোম্পানির কিছু অংশের শেয়ার কিনে তার পুনরুজ্জীবন ঘটানো হয়। এটাও তেমনই। তৃণমূল নামক কোম্পানিটা উঠে গিয়েছে। এখন ঋতব্রতেরা শেয়ার কিনে নিয়ে তৃণমূল নামটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছেন।’’

সূত্র : আনন্দবাজার, দ্য ওয়াল

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102