দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ ও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নীতির আলোকে সামুদ্রিক গবেষণায় নতুন সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডে আন্তর্জাতিক মানের একটি ‘স্মল রিসার্চ ভেসেল’ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে জাহাজটির মুরিং সহায়তার জন্য একটি সেলফ-সাসটেইন্ড পন্টুনও নির্মাণ করা হবে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) খুলনা শিপইয়ার্ডে আয়োজিত কিল-লেয়িং অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক নির্মাণকাজ শুরু হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, এমপি। এ সময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিওআরআই), বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং খুলনা শিপইয়ার্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড ও বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (বিওআরআই) মধ্যে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির (ডিপিএম) আওতায় নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী একটি স্মল রিসার্চ ভেসেল, একটি সেলফ-সাসটেইন্ড পন্টুন, দুটি হাই-স্পিড কেবিন বোট এবং ২৫০ মিটার দীর্ঘ জেটি ও গ্যাংওয়ে নির্মাণ করা হবে।
যুক্তরাজ্যের ডিজাইন প্রতিষ্ঠান Keel Marine Ltd-এর কারিগরি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাস সংস্থা Bureau Veritas (BV)-এর তত্ত্বাবধানে নির্মিতব্য গবেষণা জাহাজটির দৈর্ঘ্য হবে ৩২ মিটার, প্রস্থ ৮ মিটার এবং গভীরতা ৪ মিটার। ঘণ্টায় ১৪ নটিক্যাল মাইল গতিসম্পন্ন ২৫০ টন ডিসপ্লেসমেন্ট ক্ষমতার এ জাহাজে মাল্টি বিম ইকো সাউন্ডার (MBES) ও সিঙ্গেল বিম ইকো সাউন্ডার (SBES) সংযোজিত থাকবে, যা সমুদ্রের গভীরতা নিরূপণ, সমুদ্রতলের মানচিত্রায়ণ এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক জরিপে ব্যবহৃত হবে।
এ ছাড়া ভাইব্রো কোরার, বক্স কোরার ও অ্যাকোস্টিক ডপলার কারেন্ট প্রোফাইলার (ADCP) প্রযুক্তির মাধ্যমে সমুদ্রতলের মাটির নমুনা সংগ্রহ এবং সমুদ্রস্রোত পরিমাপ করা সম্ভব হবে। জাহাজটিতে জীববিজ্ঞান, রসায়ন ও পরিবেশভিত্তিক সামুদ্রিক গবেষণার জন্য আধুনিক ল্যাব সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা সরঞ্জাম সংযুক্ত থাকবে, যা দেশের সামুদ্রিক গবেষণা ও হাইড্রোগ্রাফিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করবে।
প্রকল্পের আওতায় খুলনা শিপইয়ার্ডের নিজস্ব নকশা ও ইনল্যান্ড শিপিং বিধিমালা অনুসারে ৩৬ মিটার দৈর্ঘ্য, ১০ মিটার প্রস্থ এবং ২ দশমিক ৪০ মিটার গভীরতার একটি সেলফ-সাসটেইন্ড পন্টুনও নির্মাণ করা হবে। ৩৯০ টন ডিসপ্লেসমেন্ট ক্ষমতাসম্পন্ন এ পন্টুন গবেষণা জাহাজ ও স্পিডবোটের মুরিং, জ্বালানি ও খাবার পানির সরবরাহ এবং গবেষক ও কর্মীদের আবাসন ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করবে।
২০২৮ সালের মধ্যে গবেষণা জাহাজটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অধীনে আসে। নৌবাহিনীর পরিচালনায় রাষ্ট্রায়ত্ত এই শিপইয়ার্ড ইতোমধ্যে ৮০০টির বেশি নতুন জাহাজ নির্মাণ এবং আড়াই হাজারেরও বেশি জাহাজ মেরামতের সাফল্য অর্জন করেছে। যুদ্ধজাহাজ, পেট্রোল ভেসেল, সার্ভে ভেসেল, ফেরি ও বাণিজ্যিক জলযান নির্মাণে প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সম্পূর্ণ দেশীয় সক্ষমতায় আন্তর্জাতিক মানের এই গবেষণা জাহাজ নির্মাণ বাংলাদেশের নৌ-শিল্পের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে এবং এর সফল বাস্তবায়ন দেশের সামুদ্রিক গবেষণা ও ব্লু ইকোনমি উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।