২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এনডিটিভির একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিষয়টি প্রথম ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। সম্প্রতি সেই তথ্য আবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
বর্তমান সময়ে যেখানে কর্মব্যস্ততা, স্বাস্থ্য জটিলতা, মানসিক চাপ এবং পরিবার পরিকল্পনার নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক দম্পতি সন্তান গ্রহণে দ্বিধায় ভোগেন, সেখানে আফ্রিকার এই কৃষকের বিশাল পরিবার নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুসার বয়স প্রায় ৬৮ বছর। তিনি উগান্ডার পূর্বাঞ্চলের একজন সাধারণ কৃষক হিসেবে জীবনযাপন করেন। তবে তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা এত বেশি যে, দৈনন্দিন কাজকর্ম—যেমন রান্না, খাবার পরিবেশন বা ব্যবস্থাপনা—সবই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। একসঙ্গে সবাই বসে খাওয়াও অনেক সময় সম্ভব হয় না। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, প্রথম ও শেষ সন্তানের নাম মনে থাকলেও মাঝের অনেকের নাম তার স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেছে, তাই তিনি একটি খাতায় নাম লিখে রাখেন।

এত বড় পরিবার গড়ে ওঠার পেছনে তার নিজের দীর্ঘদিনের পরিবার বৃদ্ধির প্রবণতাও ভূমিকা রেখেছে বলে জানা যায়। তিনি তরুণ বয়সে একাধিক বিয়ে করেন, যা স্থানীয় কিছু গ্রামীণ সমাজে আগে সামাজিকভাবে স্বীকৃত ছিল। সেই সময়ে বড় পরিবারকে শক্তি, মর্যাদা এবং কৃষিকাজে সহায়তার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক দশক আগেও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে বেশি সন্তান নেওয়ার প্রবণতা স্বাভাবিক ছিল। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায় এখন সেই প্রবণতা অনেকটাই কমে এসেছে। বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, উগান্ডাসহ সাব-সাহারান আফ্রিকার কিছু দেশে এখনো তুলনামূলকভাবে জন্মহার বেশি হলেও এমন বিশাল পরিবার বিরল ঘটনা।
বর্তমানে এত বড় পরিবার পরিচালনা করতে গিয়ে আর্থিক ও দৈনন্দিন চাপে পড়েছেন মুসা নিজেই। তিনি জানিয়েছেন, কৃষিকাজের ওপর নির্ভর করেই পুরো পরিবার চলছে এবং পরিবারের অনেক সদস্যও মাঠে কাজ করেন। তবুও এত মানুষের দায়িত্ব সামলানো তার জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

তিনি এখন আর সন্তান না নেওয়ার পক্ষেও মত দিয়েছেন এবং স্ত্রীদেরও পরিবার পরিকল্পনা অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন। খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় ক্রমেই বেড়ে যাওয়ায় বড় পরিবার পরিচালনা করা আগের মতো সহজ নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মুসার এই গল্প ভাইরাল হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, কেউ আবার রসিকতা করে বলেছেন—একাই যেন তিনি একটি গ্রাম তৈরি করেছেন। আবার অনেকেই মন্তব্য করেছেন, বর্তমান সময়ে একজন সন্তানের দায়িত্বই অনেক কঠিন, সেখানে ১০২ জনকে বড় করা সত্যিই অবিশ্বাস্য। পাশাপাশি কিছু মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন—এত বড় পরিবারে সবার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে তার স্ত্রী সংখ্যা নিয়েও ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। কোথাও ৮ জন স্ত্রীর কথা উল্লেখ করা হলেও অধিকাংশ সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ১২ জন স্ত্রীর তথ্যই বেশি প্রচলিত।

জনসংখ্যাবিদরা বলছেন, আধুনিক সময়ে বড় পরিবার শুধু সামাজিক নয়, বরং বড় অর্থনৈতিক চাপও তৈরি করে। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই ছোট পরিবারের প্রবণতা বাড়ছে, কারণ সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উল্লেখযোগ্য ব্যয় প্রয়োজন হয়।
তবে সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কিছু কৃষিনির্ভর অঞ্চলে এখনো পরিবারকে শ্রমশক্তির অংশ হিসেবে দেখা হয়। সেখানে বেশি সন্তান মানে বেশি কর্মক্ষম সদস্য, যা জীবনধারণে সহায়ক হতে পারে।
সব মিলিয়ে মুসা হাসাহিয়ার এই ঘটনা শুধু একটি ব্যতিক্রমী পারিবারিক গল্প নয়, বরং আফ্রিকার গ্রামীণ সমাজ, জনসংখ্যা প্রবণতা, দারিদ্র্য এবং সামাজিক বাস্তবতারও একটি প্রতিফলন। বিশ্ব যখন ছোট ও পরিকল্পিত পরিবারের দিকে এগোচ্ছে, তখন তার পরিবার যেন এক ভিন্ন বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরছে।
সূত্র: হিন্দুস্থান টাইমস ও এনডিটিভির প্রতিবেদন অবলম্বনে।







