রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ০৮:২৩ অপরাহ্ন

‘রামিসার মৃত্যু শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি’

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

রোববার (২৪ মে) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা মানবিকতার সব সীমা অতিক্রম করেছে। এটি শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; সমগ্র জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়া এক নির্মম বাস্তবতা।

সংবাদ সম্মেলনে এলিনা খান অভিযোগ করেন, দেশে শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনা ক্রমাগত বাড়লেও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। তার ভাষায়, অপরাধীদের মধ্যে একটি ভয়ংকর ধারণা তৈরি হয়েছে—মামলা বছরের পর বছর চলবে, তদন্ত দুর্বল হবে, এরপর জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসা যাবে।

তিনি বলেন, অতীতের বহু আলোচিত মামলায় তদন্তে ত্রুটি, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহে গাফিলতি এবং দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার কারণে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রামের রাউজানে সীমা চৌধুরী ধর্ষণ ও রহস্যজনক মৃত্যু এবং ১৯৯৮ সালে ঢাকার আদালত এলাকায় শিশু তানিয়া ধর্ষণ মামলার কথা উল্লেখ করেন।

এলিনা খান বলেন, বিচার বিলম্ব মানেই অনেক ক্ষেত্রে বিচার অস্বীকার। তার মতে, বিচারিক আদালতে রায় হলেও উচ্চ আদালতে মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকার কারণে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো নতুন করে মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করে।

মাগুরার আলোচিত আছিয়া হত্যা মামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় হওয়া ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হলেও উচ্চ আদালতে কার্যকর শুনানি এখনো শুরু হয়নি। ‘শিশু হত্যা ও ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর মামলাগুলো কেন বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকবে?’—প্রশ্ন তোলেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, অনেক সাধারণ মানুষ এজাহার কীভাবে লিখতে হয়, সেটিই জানেন না। ফলে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়ে যায়। কখনো পুলিশ বা আইনজীবীর অবহেলা কিংবা অপকৌশলেও মামলার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এর সুযোগ নিয়ে অনেক অভিযুক্ত সহজেই জামিন পেয়ে যায় বা পরে খালাস পায়।

তিনি অভিযোগ করেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুরতহাল ঘটনাস্থলে না করে থানায় বা হাসপাতালের মর্গে সম্পন্ন করা হয়, যা আইনসঙ্গত নয়। পাশাপাশি ফরেনসিক, পোস্টমর্টেম, ভিসেরা ও ডিএনএ রিপোর্ট পেতে বছরের পর বছর লেগে যায়। ‘একটি রিপোর্ট পেতে দুই-তিন বছর পর্যন্ত সময় লাগে। এর ফলে বিচারকাজ শুরু হতেও দেরি হয় এবং সাক্ষীরা হারিয়ে যেতে থাকে,’ বলেন তিনি।

সাক্ষী সুরক্ষার দুর্বল ব্যবস্থাকেও বিচার বিলম্বের বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন এলিনা খান। তিনি বলেন, বাদীরা বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। উচ্চ আদালতে গেলে তাদের আরও আর্থিক ও মানসিক ভোগান্তি বাড়ে।

সংবাদ সম্মেলনে রামিসার বাবার বক্তব্যও তুলে ধরা হয়। এলিনা খান বলেন, তিনি বলেছেন—‘আমি বিচার চাই না।’ একজন বাবার মুখে এই কথা উচ্চারিত হওয়া রাষ্ট্রের প্রতি গভীর হতাশার প্রতিফলন।

তবে রামিসা হত্যা মামলায় দ্রুত বিচার সম্ভব বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রয়েছে এবং আলামতও উদ্ধার করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অভিযোগপত্র দাখিলের নির্দিষ্ট সময়সীমাও রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলন থেকে কয়েকটি সুপারিশও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার জন্য বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন, সাত দিনের মধ্যে পোস্টমর্টেম, ডিএনএ ও ভিসেরা রিপোর্ট সম্পন্ন করা, সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উচ্চ আদালতে দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা করা।

এ ছাড়া পাবলিক প্রসিকিউটরদের আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে এলিনা খান বলেন, নির্ধারিত সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন না এলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও চিকিৎসকদের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাইতে হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে তিনি রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগের প্রতি জোর দাবি জানিয়ে বলেন, শিশু ও নারী নির্যাতনের মামলাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে সমাজ আরও ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে যাবে।

তিনি বলেন, আমরা নতুন করে আর কোনো রামিসার কান্না শুনতে চাই না। অপরাধীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা যেতে হবে—এই দেশে ধর্ষণ ও হত্যার পর কেউ পার পাবে না।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102