বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ০২:০৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :

শ্রীমঙ্গলে মিড-ডে মিল নিয়ে নানা অনিয়ম, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬

সরকারের বরাদ্দকৃত পুষ্টিকর খাবার শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানোর কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক বিদ্যালয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে নিম্নমানের বন রুটি, মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য, নষ্ট সেদ্ধ ডিম, দুর্গন্ধযুক্ত দুধ ও কাঁচা কলা। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ অভিভাবক ও শিক্ষকদের।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিচালিত এ কর্মসূচিতে শ্রীমঙ্গল উপজেলা ও পৌরসভার ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) যৌথভাবে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তবে বাস্তব চিত্রে দেখা গেছে চরম অব্যবস্থাপনা।

অভিযোগ রয়েছে, খাবার সরবরাহের দায়িত্বে থাকা কুলাউড়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইসলাম ট্রেডার্স কর্মসূচির শুরু থেকেই খাবারের গুণগত মান বজায় না রেখে দায়সারাভাবে সরবরাহ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সম্প্রতি নানা অভিযোগের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় এক সপ্তাহ ধরে খাবার সরবরাহও বন্ধ রেখেছে।

সরেজমিন আশিদ্রোন ইউনিয়নের টিকরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা স্কুলের মিড-ডে মিল না পেয়ে পাশের দোকান থেকে খাবার কিনে খাচ্ছে। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পূরবী রাণী ধর জানান, গত ১ মে থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ইসলাম ট্রেডার্স’ কোনো খাবার সরবরাহ করছে না। তিনি বন রুটির প্যাকেট খুলে দেখান, সেখানে চুল পাওয়া গেছে এবং অনেক প্যাকেটে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখও নেই। সেগুলো সংরক্ষণে রেখেছি।

কালিঘাট ইউনিয়নের ফুলছড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জলি দেব বলেন, সরকার নির্ধারিত রুটিন অনুযায়ী দুধের সঙ্গে বিস্কুট, ডিমের সঙ্গে বন রুটি ও কলার সঙ্গে বন রুটি দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সিঙ্গেল আইটেম দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ ও তারিখবিহীন বন রুটিও পাওয়া যায়। সেগুলো আমরা শিক্ষার্থীদের খেতে দেইনি। গত শনি ও রোববার কোনো ধরনের খাবারও পাইনি। বিদ্যালয়ে ১৯২ শিক্ষার্থী থাকলেও সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে মাত্র ১৬৫ জনের খাবার। চাহিদা অনুযায়ী খাবার কম পাওয়ায় বাচ্চাদের মধ্যে বণ্টন করতে হিমশিম খেতে হয়।

রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. এনামুল কবির জানান, অনেক সময় দুর্গন্ধযুক্ত দুধ ও নষ্ট ডিম ফেলে দিতে হয়েছে। স্কুল ছুটির পর বিকেলে খাবার পৌঁছায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

শ্রীমঙ্গল পৌরসভা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাজী কানিজ ফাতেমা বলেন, নিয়মিত রুটিন অনুযায়ী খাবার পাচ্ছি না। নির্ধারিত খাবারেও কম দেওয়া হচ্ছে। প্রায় দিনই সিঙ্গেল আইটেম দিতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

উপজেলার ভাড়াউড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার শুধু বন রুটি বিতরণ করা হচ্ছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহেদা শারমিন বলেন, সরকারের নির্ধারিত রুটিন অনুযায়ী আমরা খাবার পাচ্ছি না। দুধের সঙ্গে বিস্কুট, ডিমের সঙ্গে বন রুটি ও কলার সঙ্গে বন রুটি দেওয়ার কথা থাকলেও এখন সিঙ্গেল আইটেম দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, যেদিন শুধু বন রুটি দেওয়া হয়, সেদিন শিক্ষার্থীদের খেতে কষ্ট হয়।

একই চিত্র উপজেলার অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকরা বলেন, অনেকসময় দুপুর ১টার আগে খাদ্য পৌঁছে না। শিক্ষার্থীরা চলে যাওয়ার পর ঠিকাদারের লোক খাদ্য নিয়ে পৌঁছে। সকালের শিফটের শিক্ষার্থীরা দুপুর ১২টার মধ্যে ছুটি হলে তারা বঞ্চিত হয়। এতে খাদ্যের অপচয় হয়। শিক্ষার্থীরা বলছে, প্রথম দিকে সব খাবার দেওয়া হতো, এখন খাবার কম দেওয়া হয়। বিশেষ করে শুধু বন রুটি যেদিন দেওয়া হয়, সেদিন খেতে কষ্ট হয়। এ ছাড়া মাঝেমধ্যে দুর্গন্ধযুক্ত দুধ, নষ্ট ডিম ও কাচা কলা খেতে তাদের কষ্ট হচ্ছে।

শিক্ষার্থীরা জানায়, শুরুতে নিয়মিত খাবার পেলেও এখন খাবারের মান ও পরিমাণ দুটোই কমেছে। অনেক সময় দুর্গন্ধযুক্ত খাবার খেতে কষ্ট হয়।

খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ইসলাম ট্রেডার্স’-এর ম্যানেজার সাইফুর রহমান অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার না করে বলেন, কিছু সমস্যা থাকতে পারে, আমরা সমাধানের চেষ্টা করছি। ফ্যাক্টরির সমস্যা থাকায় আপাতত এক সপ্তাহ খাদ্য সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, নিম্নমানের খাবার, মেয়াদোত্তীর্ণ বন রুটি ও অর্ধসিদ্ধ ডিম সরবরাহের বিষয়ে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আমার কাছে অভিযোগ করেছেন। আমি একাধিকবার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করেছি এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। ইউএনও মহোদয়ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেছেন।

খাবার সরবরাহ বন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে এক সপ্তাহ খাবার সরবরাহ বন্ধ রাখার বিষয়েও আমাকে লিখিতভাবে জানিয়েছে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, বিষয়টি আমার ডিপার্টমেন্টের না। তবে আপনাদের মাধ্যমে এসব বিষয় জানার পর ঠিকাদারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে। খাবার সরবরাহ বন্ধের বিষয়টি আমার জানা নেই, আমি খোঁজ নিচ্ছি।

এদিকে, সরকারের মহৎ এই উদ্যোগকে ভেস্তে দিয়ে শিশুদের পুষ্টির বদলে স্বাস্থ্যঝুঁকির ঘটনায় ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা। অভিভাবকদের ভাষ্য, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। অথচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। অনিয়ম বন্ধ করে প্রকল্পে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা। একই সঙ্গে মানসম্মত খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান অভিভাবকরা।

নিম্নমানের খাবার বিতরণে শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সচেতনমহলরও তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার সরকারি প্রকল্পে এমন অব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুঃখজনক। তারা অবিলম্বে অনিয়ম বন্ধ, মানসম্মত খাবার নিশ্চিত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102