বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ১১:৪৪ অপরাহ্ন

আমেরিকার সাম্রাজ্য ভেঙে বিশ্বের নতুন নেতৃত্বে আসছে চীন?

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬

চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই যুক্তরাষ্ট্র ইরান ও ভেনিজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়েছে। পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আলোচনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন কূটনৈতিক উত্তেজনা নয়; বরং এটি বিশ্ব রাজনীতিতে একটি গভীর ও ভূকম্পীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।

বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে সম্ভাব্য শক্তি প্রয়োগের আলোচনা ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য বড় একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, আমেরিকান নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং তার জায়গায় ফিরে আসছে ‘ক্ষমতার রাজনীতি’, যেখানে আন্তর্জাতিক নিয়ম বা প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে বড় শক্তিগুলোর ইচ্ছাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারের বক্তব্য এই মানসিকতারই প্রতিফলন। তিনি বলেন, আমরা একটি পরাশক্তি। আমরা যা চাই, তা-ই করতে পারি।

বিশ্বব্যাপী এই পুনর্গঠনের সময়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে এই পরিবর্তন কি চীনের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে?

মার্ক কার্নির সতর্কবার্তা

গত ২০ জানুয়ারি দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বৈশ্বিক অর্থনীতি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং ভূরাজনীতিতে চলমান বড় ধরনের পরিবর্তনের বিষয়ে সতর্ক করেন।

কার্নির মতে, বর্তমান বিশ্ব এমন এক সময়ে প্রবেশ করছে, যেখানে ‘নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’ ক্রমশ ভেঙে পড়ছে এবং তার জায়গায় আরও কঠোর ও বাস্তববাদী ভূরাজনীতি স্থান করে নিচ্ছে।

তিনি ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্র শুধু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি থেকে সরে আসছে না, বরং সেই ব্যবস্থাকে পুনর্গঠনেরও চেষ্টা করছে—বিশেষ করে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সম্পর্কের ক্ষেত্রে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, ‘পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা’ বলতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন উদারনৈতিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়।

এই ব্যবস্থার ভিত্তি ছিল বিশ্বায়ন, মুক্ত বাণিজ্য এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা। এর ফলেই জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং পরবর্তীতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)-র মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।

দীর্ঘ সময় ধরে এই ব্যবস্থার প্রধান চালিকাশক্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা। অন্যান্য দেশও সহযোগিতা করেছে, তবে আমেরিকাই ছিল এর প্রধান রক্ষক।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় সেই প্রবণতা আরও জোরালো হয়।

ওয়াশিংটনের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক ব্যবস্থার জন্য অতিরিক্ত মূল্য দিচ্ছে, অথচ অন্য দেশগুলো তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র হয় এই ব্যবস্থার দায়িত্ব কমাতে চায়, নয়তো অন্য দেশগুলোকেও আরও বেশি অবদান রাখতে বাধ্য করতে চায়।

চীনের উত্থান

স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের মধ্যে চীন অন্যতম। গত শতকের বেশিরভাগ সময় চীন ছিল না কোনো বৈশ্বিক পরাশক্তি, না ছিল সমৃদ্ধ অর্থনীতি। কিন্তু ২০০১ সালে ডব্লিউটিওতে যোগদানের পর দেশটির অর্থনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে।

চীনে বিদেশি বিনিয়োগ দ্রুত বাড়তে থাকে এবং রপ্তানিনির্ভর শিল্পায়নের মাধ্যমে দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা না থাকলে চীনের এই উত্থান সম্ভব হতো না।

হংকং-তালিকাভুক্ত এবং শেনজেনভিত্তিক কোম্পানি ‘লেদার স্টাইল’ বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবর্তনের একটি বাস্তব উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানটি এশিয়াজুড়ে ১৫০টিরও বেশি অংশীদার কারখানার সঙ্গে কাজ করে এবং ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার ১৭৫টিরও বেশি ব্র্যান্ডকে সেবা দেয়।

তাদের ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো দ্রুত উৎপাদন, বহুমুখী পণ্য সরবরাহ এবং স্বল্প পরিমাণ অর্ডার ব্যবস্থাপনা।

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি এই ব্যবস্থায় বড় ধরনের আঘাত হানে। যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ মুক্ত বাণিজ্য থেকে সরে এসে আরও সংরক্ষণবাদী ও বণিকবাদী নীতির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক ১০০ থেকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক ব্যবসায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে অনেক কোম্পানি নতুন অর্ডার দিতে বিলম্ব করতে শুরু করে।

এই পরিস্থিতিতে লেদার স্টাইল তাদের উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে। ইউরোপীয় বাজারের জন্য তুরস্ক, উচ্চমানের পণ্যের জন্য পর্তুগাল, কম খরচের উৎপাদনের জন্য উত্তর আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকার বাজারের জন্য দক্ষিণ আমেরিকায় উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে শুধু ব্যবসায়িক ঝুঁকি নয়, চীনা বিনিয়োগকারীদের এখন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনা করতে হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রই ঠিক করতে পারে কোন দেশ চীনের সঙ্গে ব্যবসা করবে আর কোনো দেশ করবে না।

ইরান-ভেনিজুয়েলায় উত্তেজনা

ইরান ও ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ চীনের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগের কারণ। কিছু হিসাব অনুযায়ী, এই দুই দেশ মিলিয়ে চীনের মোট তেল আমদানির প্রায় ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ সরবরাহ করে।

ফলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ক্রমাগত চাপ বাড়ায়, তাহলে ভবিষ্যতে চীনকে নিজের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি স্বার্থ রক্ষার জন্য লাতিন আমেরিকায় আরও সক্রিয় সামরিক বা নিরাপত্তামূলক ভূমিকা নিতে হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটা কি চীনের জন্য সুযোগ?

বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন চীনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করলেও এটি নতুন সুযোগও এনে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন বৈশ্বিক নেতৃত্ব থেকে আংশিক সরে আসছে, তখন অনেক দেশ- এমনকি আমেরিকার মিত্ররাও- চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার প্রয়োজন অনুভব করছে।

এ বছর বেইজিং ইতোমধ্যে কানাডা, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির নেতাদের স্বাগত জানিয়েছে।

বিশেষ করে কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে ভবিষ্যতে কানাডা ওয়াশিংটনের নির্দেশনার পরিবর্তে নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারে।

তবে নিরাপত্তা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা এখনো চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে আগ্রহী।

সাংহাইয়ের গুরুত্ব বাড়ছে

বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মুখে পড়ায় এখন ব্রিকস এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও)-র মতো আঞ্চলিক জোটগুলোর গুরুত্ব বাড়ছে। চীন এসব প্ল্যাটফর্মের অন্যতম প্রধান সদস্য হওয়ায়, ভবিষ্যতে এই সংগঠনগুলোর এজেন্ডা নির্ধারণে বেইজিং আরও বড় ভূমিকা পালন করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102