প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মুসলিম পবিত্র হজ্জ পালনের জন্য মক্কায় সমবেত হন। ৪৬° সেলসিয়াসের বেশি তীব্র গরমে এই বিশাল জনসমুদ্রের জন্য পানীয় জল এবং ওজু-গোসলের পানির ব্যবস্থা করা একটি অবিশ্বাস্য চ্যালেঞ্জ। আধুনিক প্রকৌশল এবং সৌদি সরকারের সুনিপুণ ব্যবস্থাপনায় কীভাবে এই অসাধ্য সাধন করা হয়, তা অবাক করে বিশ্বকে।
জমজম পানির অফুরন্ত সরবরাহ
হাজীদের পানীয় জলের প্রধান উৎস হলো পবিত্র জমজমের পানি। কিং আব্দুল্লাহ জমজম প্রজেক্টের মাধ্যমে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে প্রতিদিন লাখ লাখ লিটার জমজম পানি উত্তোলন, পরিশোধন এবং বোতলজাত করা হয়।
কন্টেইনার ব্যবস্থা: হারামাইন শরিফাইনের ভেতর হাজার হাজার ঠান্ডা পানির কন্টেইনার রাখা থাকে, যা প্রতিনিয়ত রিফিল করা হয়।
রোবট প্রযুক্তি: বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট ব্যবহার করে ভিড়ের মধ্যেও হাজীদের কাছে জমজমের পানি পৌঁছে দেওয়া হয়।
ওজু ও গোসলের জন্য পানির বিশাল নেটওয়ার্ক
হাজীরা যখন মিনা, আরাফাত বা মুজদালিফায় অবস্থান করেন, তখন সেখানে পানির চাহিদা থাকে তুঙ্গে। মরুভূমির এই এলাকায় পানির অভাব দূর করতে সৌদি কর্তৃপক্ষ কয়েকটি বিশেষ পদক্ষেপ নেয়:
১. বিশাল পানি সংরক্ষণাগার: মক্কার পাহাড়ের ওপর এবং মাটির নিচে বিশাল সব ‘ওয়াটার ট্যাংক’ বা পানির টাওয়ার তৈরি করা হয়েছে। মুয়াইশিম এলাকায় অবস্থিত একটি জলাধারের ধারণক্ষমতা প্রায় ১০ লাখ ঘনমিটার। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পানির রিজার্ভার।
২. সমুদ্রের পানি পরিশোধন (Desalination): মক্কার নিজস্ব কোনো নদী নেই। লোহিত সাগরের লোনা পানিকে বিশাল সব প্ল্যান্টের মাধ্যমে শোধন করে পানযোগ্য ও ব্যবহারের উপযোগী করা হয়। শোয়াইবা ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে এই পানি মক্কায় পৌঁছায়।
৩. মিনার বিশেষ পাইপলাইন: মিনা তাঁবু নগরীতে কয়েক লাখ শৌচাগার ও ওজুর স্থান রয়েছে। প্রতিটি ব্লকে অবিরাম পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্বয়ংক্রিয় সেন্সর এবং প্রেসার পাম্প ব্যবহার করা হয়।
পরিবেশবান্ধব ওজুর ব্যবস্থা
পানির অপচয় রোধে হজ্জের জায়গাগুলোতে বিশেষ ধরণের ট্যাপ বা কল ব্যবহার করা হয়, যা থেকে সীমিত পরিমাণে পানি নির্গত হয় যেন হাজীরা স্বাচ্ছন্দ্যে ওজু করতে পারেন কিন্তু পানি নষ্ট না হয়। এছাড়াও ওজুর ব্যবহৃত পানি প্রক্রিয়াজাত করে বাগানে বা শৌচাগারে পুনরায় ব্যবহারের ব্যবস্থা থাকে কিছু এলাকায়।
আরাফাত ও মুজদালিফার চ্যালেঞ্জ
আরাফাতের ময়দানে মাত্র এক দিনের অবস্থানের জন্য বিশাল পানির ট্যাংক স্থাপন করা হয়। হাজীদের সুবিধার্থে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ঠান্ডা পানির ঝর্ণা (Misting Fans) বসানো থাকে, যা পানির সূক্ষ্ম কণা বাতাসে ছড়িয়ে তাপমাত্রা কমিয়ে রাখে।
লাখ লাখ মানুষের পানির প্রয়োজন মেটানো কেবল প্রশাসনিক দক্ষতাই নয়, বরং আধুনিক বিজ্ঞানের এক অনন্য নিদর্শন। হজ্জের এই বিশাল পানি ব্যবস্থাপনা মূলত সৌদি আরবের ন্যাশনাল ওয়াটার কোম্পানির (NWC) দীর্ঘ পরিকল্পনা ও হাজার হাজার শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রমের ফসল।