এক শতাংশের কম জমি নিয়ে গড়ে ওঠা মসজিদটির দেয়ালজুড়ে প্রাচীন নকশা ও গম্বুজে রয়েছে সময়ের ছাপ। দুই পাশে দুটি জানালা ও সামনে ছোট্ট দরজা সরল গঠনে গভীর সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। এটি শুধু একটি মসজিদ নয়, বরং ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা ও অদেখা কাহিনীর নীরব ঠিকানা।
স্থানীয়দের মতে, পঞ্চদশ শতাব্দীতে সুলতানি আমলে যমুনার তীরে আসেন কয়েকজন ধর্মপ্রচারক। তারা এখানে খানকাহ ও মসজিদ গড়ে তোলেন, যেখান থেকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ইসলামের আলো।
স্থানীয় বাসিন্দা সৈয়দ আহমেদ সাবু বলেন, “আমার দাদা ও তার আগের প্রজন্মের মানুষদের কাছ থেকেও জানতে চেয়েছি, এই মসজিদ কবে নির্মিত হয়েছে তা কেউই সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারেননি। ধারণা করা হয়, এর বয়স আনুমানিক সাত থেকে আটশ বছর।”
মুমতাজুল করীম নামে স্থানীয় আরেকজন বলেন, “মুরুব্বিদের কাছ থেকে শুনেছি, একসময় এই জায়গাটি ওলু মাটি ও ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল। পরে জঙ্গল পরিষ্কার করার সময় হঠাৎ করেই মসজিদের অস্তিত্ব চোখে পড়ে। তখন থেকেই এর নাম হয় গায়েবী মসজিদ।”
মেজবাউল হক নামে স্থানীয় একজন বলেন, “ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সাহাবীরা এই স্থানটি বেছে নিয়েছিলেন এবং এখান থেকেই দেওয়ানগঞ্জ এলাকায় ইসলামের প্রচার শুরু হয়। এই মসজিদের আশপাশে দুইটি দাড়িওয়ালা সাপ ছিল, যেগুলো কাউকে ক্ষতি করত না। একটি মারা যাওয়ার পর আরেকটিকে পরে আর দেখা যায়নি।”

শুরুতে ইমামসহ মাত্র ২১ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতেন গায়েবী মসজিদে। সময়ের সাথে কাতার বেড়েছে, মসজিদও বড় হয়েছে। বর্তমানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে ভরে ওঠে প্রাঙ্গণ। শিশুদের কোরআন তেলাওয়াতে মুখর থাকে চারদিক। মুসল্লিদের দানেই চলে মসজিদের সব কার্যক্রম।
খোকন নামে এক মুসল্লি বলেন, “দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে এই মসজিদ দেখতে আসেন। মানত ও দোয়ার জন্যও অনেকে আসেন। প্রতি মাসে দানবাক্সে এক থেকে দুই লাখ টাকা পাওয়া যায়, যা দিয়ে মসজিদ পরিচালনা করা হয়।”
এখানে খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ধর্মান্তরিত এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, “আমি আগে হিন্দু ছিলাম। পরে ২০১৭ সালে আমার পরিবারসহ ইসলাম গ্রহণ করি। এখন এই মসজিদের খাদেম হিসেবে থাকতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি।”
মসজিদের ইমাম মাওলানা মো. মূসা বলেন, “প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ২০০ জন মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করেন। শুক্রবারে দূরদূরান্ত থেকে অনেক মুসল্লি এসে জুমার নামাজ আদায় করেন।”
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ জহুরুল হোসেন বলেন, “উপজেলা প্রশাসন এই মসজিদের ইতিহাস সম্পর্কে কিছু জানে না। সঠিক ইতিহাস জানার জন্য আমরা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেব।”
ইতিহাসের ভার আর রহস্যের আবরণে আজও নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা গায়েবী মসজিদটি যথাযথ সংরক্ষণ করা গেলে এটি শুধু জামালপুর নয়, বরং পুরো ময়মনসিংহ বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও প্রত্নপর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।







