শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ন

টেকনাফ এখন মানব ও মাদক পাচারের ‘হট রুট’

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

টেকনাফ উপকূলের বাহারছড়া থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত ৪৭ নৌঘাট দিয়ে অবাধে চলছে মানবপাচার। এর সঙ্গে জড়িত প্রতিটি নৌঘাটের সভাপতি-সম্পাদকসহ প্রায় দুই শতাধিক দালাল চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ বেশি বেতনে চাকরি উন্নত জীবনের আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগর পথে মালয়েশিয়া পাড়ি জমাচ্ছে, পাশাপাশি স্থানীয় বেকার ছেলে এবং স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসাপড়ুয়া অল্পবয়সি ছেলেরা রয়েছে।

উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গা তরুণী-কিশোরীদের পাচার করে বিনিময়ে লাখ লাখ পিস ইয়াবা আমদানি করার ভয়াবহ তথ্য পাওয়া গেছে। ইতোমধ‍্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এসব মাদকের অনেক চালান ধরা পড়েছে এবং মালয়েশিয়া পাচারের সময় অনেক রোহিঙ্গা ভিকটিম উদ্ধার হয়েছে, আটক হয়েছে দালালেরাও। কিন্তু পর্দার আড়ালে থেকে গেছে আসল চক্র।

প্রশাসন তাদের ধরতে তৎপর হলেও অদৃশ‍্য কারণে তারা থেকে যায় বহাল তবিয়তে। এসব দুর্ধর্ষ মাদক কারবারিরা বর্তমানে মানব পাচার মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে।

সীমান্ত উপজেলা টেকনাফের নাফ নদী ও সমুদ্র উপকূলবর্তী ইউনিয়ন সেন্ট মার্টিন, সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ, পৌরসভা, টেকনাফ সদর, বাহারছড়া, হ্নীলা, হোয়াইক্যং-সহ নাফ নদী ও সমুদ্র উপকূলের ৪৭ নৌঘাট এখন মানব পাচারের এয়ারপোর্টে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি ফেরার পথে মানবের বদল করে মিয়ানমার থেকে একই বোট নিয়ে আসা হচ্ছে ইয়াবা-আইসের বড় বড় চালান।

জানা যায়, টেকনাফ উপজেলা বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে মালয়েশিয়া পাচারের সময় প্রায় শতাধিক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষসহ রোহিঙ্গা ও স্থানীয় দালালকে আটকের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করেছে। ইয়াবা-মানব পাচারের সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই নৌঘাট পয়েন্ট দিয়ে মাদক ও মানব চলছে দেদারসে।

বিশেষ করে সেন্ট মার্টিন ছেঁড়া দ্বীপ, দক্ষিণ পাড়া ঘাট, শাহপরীর দ্বীপের জালিয়া পাড়া, গোলারচর, মিস্ত্রি পাড়া, দক্ষিণ পাড়া, পশ্চিম পাড়া ঘাট, টেকনাফ সদরের মহেশ খালিয়া পাড়া, তুলাতুলী, লম্বরী ঘাট, মিঠা পানির ছড়া, হাবিব ছড়া ঘাট, সাবরাং ইউনিয়নের কচুবনিয়া, কাঁটাবনিয়া, খুরের মুখ সংলগ্ন নৌঘাট, বাহাড় ছড়া, মুন্ডার ডেইল, হাদুর ছড়া ঘাট, কুরাবুইজ্যা পাড়া ঘাট, টেকনাফ পৌর সভার নাইট্যং পাড়া, বড়ইতলী, কেরুনতলী, দমদমিয়া, মোচনী, লেদা, আলীখালি, ফুলের ডেইল, উপকূলীয় ইউনিয়ন বাহারছড়া নোয়াখালী পাড়া, জুম্মা পাড়া, হাজাম পাড়া, কচ্ছপিয়া, বড় ডেইল ঘাটসহ বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে মানব পাচার ও ইয়াবা প্রবেশ হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

মানবপাচারের মতো এই মানবতাবিরোধী কাজে লিপ্ত রয়েছে প্রায় দুই শতাধিক দালাল ও গডফাদার এবং এদের সহযোগিতায় রয়েছে অগণিত সোর্স।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, এর আগে স্থানীয়রা অবৈধভাবে সাগর পথে মালয়েশিয়া পাড়ি দিলেও সরকারের জনসচেতনামূলক প্রচারণায় এখন তারা সেই ঝুঁকি নিচ্ছে না, অনেক সরকারিভাবে মালয়েশিয়া গেলেও বেশির ভাগ মানুষ নৌপথে মালয়েশিয়া যাচ্ছে। এর মধ‍্যে বর্তমান সময়ে অবৈধ পথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোহিঙ্গারাই মালয়েশিয়া যাচ্ছে বেশি।

রোহিঙ্গাদের প্রথমে দালালেরা ১০ হাজার টাকা হাত বদল করে ক্যাম্প থেকে সিএনজি, অটোরিকশা ও বাসযোগে টেকনাফ পৌর এলাকায় নিয়ে এসে দালালের কাছে জমা রাখে, পরে তাদের আবার দশ হাজার টাকায় আসল দালালের কাছে বিক্রি করে দেয়। পরে তাদের ছোট নৌকায় তুলে মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন সাগর থেকে অন্তত ৫ কিলোমিটার গিয়ে বড় বোটে তুলে দেয়। সে বোট রাতের মধ্যেই মিয়ানমারে পৌঁছায়। পরে বড় জাহাজে করে তাদের শক্তিশালী মানবপাচার সিন্ডিকেটের সদস্যরা মালয়েশিয়া পৌঁছায়। এভাবে তারা প্রতিজন থেকে ৩ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ বাহারছড়া বিভিন্ন ঘাটের সমুদ্র সৈকত এলাকার পার্শ্ববর্তী বাড়ি ও ঝোপ-জঙ্গলে এনে জড়ো করে রাখে। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে তাদের বের করে ছোট ছোট ফিশিং বোট দিয়ে মিয়ানমার পৌঁছে দেয় এবং মিয়ানমার থেকে আসার সময় ইয়াবার বড় বড় চালান নিয়ে ভোরে আসে কারবারিরা।

পাচারের পর মিয়ানমারে এসব রোহিঙ্গা তরুণ-তরুণীর ভাগ্যে কী জুটছে তা আর জানা যাচ্ছে না। সেখানে নিয়ে দ্বিতীয় দফা মুক্তিপণ দাবি করে ফিরে আসছে এমন অভিযোগ অনেকের। মিয়ানমার থেকে গভীর সমুদ্র পাড়ি দিয়ে থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়া প্রবেশ করে বলেও নিশ্চিত করেছে অনেকে।

সাম্প্রতিক সময়ে দালালের জিম্মি দশা থেকে মুক্তিপণ দিয়ে অনেকে ফিরে আসলেও থেমে নেই মানবপাচার এবং অপহরণ।

সর্বশেষ আন্দামান দ্বীপে ২৭৩ জন যাত্রীবাহী ট্রলারডুবির ঘটনায় ৯ জন বেঁচে ফেরার তথ‍্য থাকলেও প্রায় ২৫০ জন নিখোঁজ রয়েছে বলে নিশ্চিত করে জাতিসংঘ।

এ ঘটনায় দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয় এবং সীমান্ত শহর টেকনাফে চলছে শোকের মাতম। স্বজনহারা পরিবারের আর্তনাদে আকাশ ভারী হয়ে উঠেছে। ট্রলারডুবির এ ঘটনায় অনেক দালাল চক্রের অনেকের নাম প্রকাশিত হলেও এখনো তারা আছে বহাল তবিয়তে।

টেকনাফ কোস্ট গার্ড মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণ ও রোধে গোয়েন্দা কার্যক্রম চলমান রেখেছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে মাদকের বড় চালান ও পাচারকারী আটক করতে সক্ষম হয়েছে এবং অভিযান অব‍্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।

টেকনাফ মডেল ওসি মো. সাইফুল ইসলাম জানান, মানব পাচার, মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত দালালদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বসহকারে দেখছি। স্থানীয় দালাল ও মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

এদিকে ১৪ এপ্রিল টেকনাফে কৃষক কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে মাদক, অপহরণ ও মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের জন‍্য স্থানীয় এমপি শাহাজান চৌধুরীর দাবির প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, শিগগিরই এসব অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102