ঘটনাটি ঘটেছে কলিয়াবর কো-ডিস্ট্রিক্টের রূপহীহাট থানার অন্তর্গত ১ নম্বর কাঠপাড়া গ্রামে। নগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আবোতানি ডোলের ভাষ্যমতে, রাত আনুমানিক ২টার দিকে ১০-১২ জনের একটি সশস্ত্র দল একটি বাড়িতে প্রবেশ করে। তারা পরিবারের সদস্যদের বেঁধে রেখে ছয় বছরের এক কন্যাশিশুকে ছুরির মুখে জিম্মি করে নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করে।
লুটেরারা পালিয়ে যাওয়ার সময় পরিবারের আর্তচিৎকারে প্রতিবেশীরা জড়ো হন। বিক্ষুব্ধ জনতা ধাওয়া করে চারজন সন্দেহভাজনকে ধরে ফেলে এবং পুলিশের উপস্থিতির আগেই তাদের পিটুনি দেয়।
গণপিটুনির শিকার হয়ে ঘটনাস্থলেই দুই মুসলিমের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তৃতীয় একজনকে নগাঁও মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চতুর্থ ব্যক্তির অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। নিহতরা হলেন— সাইফুল্লাহ, আজিবুর ওরফে খাইরুল এবং এনামুল হক। তারা সকলেই মুসলিম সম্প্রদায়ের। তবে আহত চতুর্থ ব্যক্তির পরিচয় এখনো নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
মুসলিম হত্যায় কুখ্যাত নগাঁও জেলা
নগাঁও জেলায় মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ২০১৭ সালে নগাঁও এবং ২০২৩ সালে মরিগাঁওয়ে গরু চোর বা চুরির সন্দেহে মুসলিমদের পিটিয়ে মারার নজির রয়েছে। উল্লেখ্য, এই নগাঁও জেলাই ১৯৮৩ সালের কুখ্যাত ‘নেল্লি গণহত্যা’র সাক্ষী, যেখানে হাজার হাজার বাঙালি মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছিল—যার বিচার আজও অধরা।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই ধরনের হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং কয়েক দশক ধরে আসামে মুসলিমদের অমানবিকীকরণের যে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা চলছে, এটি তারই পরিকল্পিত ফল।
২০২১ সালে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ক্ষমতায় আসার পর থেকে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চরমে পৌঁছেছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী নিজেই প্রকাশ্যে ‘মিয়া’দের (বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিম) কোমর ভেঙে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। এমনকি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আসাম বিজেপির অফিসিয়াল এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে একটি উস্কানিমূলক ভিডিও প্রকাশ করা হয়। সেখানে মুখ্যমন্ত্রীকে প্রতীকীভাবে মুসলিম ব্যক্তিদের ছবিতে রাইফেল দিয়ে গুলি করতে দেখা যায়, যার ক্যাপশন ছিল— “পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক শট” এবং “নো মার্সি” (কোনো দয়া নেই)। এই ঘটনাকে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মীরা গণহত্যার উস্কানি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
উচ্ছেদ অভিযানের নামে ভিটেমাটি ছাড়া হাজারো পরিবার
২০২১ থেকে ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত আসামে এক ভয়াবহ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। সরকারি তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক বছরে ২২,০০০-এর বেশি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০,০০০-এর বেশি মুসলিম পরিবারকে তাদের পৈত্রিক ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে।
শুধুমাত্র ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে শোণিতপুরে ১,২০০ ঘরবাড়ি এবং ফেব্রুয়ারিতে হাইলাকান্দিতে ৫১৬টি ঘর বুলডোজার দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনের প্রাক্কালে এই ধরনের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় বৈষম্য আসামের মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ক্ষমতাসীন দল।