রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাতই যখন চারপাশ কুকুরের ডাকে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে, তখন অনেকের মনেই দানা বাঁধে নানা রহস্য ও আতঙ্ক। কেউ মনে করেন এটি কোনো অশুভ সংকেত, আবার কেউ একে নিছক প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ বলে উড়িয়ে দেন। মাঝরাতে কুকুরের এই ডাকার কারণ নিয়ে বিজ্ঞান ও ইসলামের দৃষ্টিতে ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা রয়েছে।
মাঝরাতে হঠাৎ কুকুরের একটানা ডাক বা ‘কান্নার’ মতো আওয়াজ শুনে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। লোকজ বিশ্বাসে একে অমঙ্গল মনে করা হলেও বিজ্ঞান ও ইসলামি দর্শনে এর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে।
বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা: কেন রাতে কুকুর বেশি ডাকে?
বিজ্ঞানীদের মতে, কুকুর একটি সামাজিক প্রাণী এবং তাদের ডাকার পেছনে নির্দিষ্ট কিছু জৈবিক ও পরিবেশগত কারণ থাকে:
যোগাযোগের মাধ্যম (Communication): কুকুরেরা উচ্চস্বরে ডাকার (Howling) মাধ্যমে নিজেদের দলের অন্য সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করে। রাতে চারপাশ শান্ত থাকায় তাদের ডাক অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছায়, যা অন্য কুকুরদের নিজেদের অবস্থান জানাতে সাহায্য করে।
সীমানা রক্ষা (Territorial Defense): কুকুর অত্যন্ত আঞ্চলিক প্রাণী। রাতের বেলা তাদের এলাকায় অপরিচিত মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণীর আনাগোনা টের পেলে তারা ডাকতে শুরু করে। এটি মূলত অন্যকে সতর্ক করার একটি সংকেত।
বিচ্ছেদ বেদনা বা একাকীত্ব (Separation Anxiety): রাতে যখন চারপাশ নিঝুম হয়ে যায়, তখন অনেক কুকুর একাকীত্ব অনুভব করে। বিশেষ করে পোষা কুকুররা তাদের মালিকের সান্নিধ্য না পেলে বা একঘেয়েমি থেকে চিৎকার করতে পারে।
তীক্ষ্ণ শ্রবণশক্তি: মানুষের কানে ধরা পড়ে না এমন অনেক সূক্ষ্ম শব্দ (যেমন উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ বা অতি ক্ষুদ্র প্রাণীর চলাচল) কুকুর শুনতে পায়। সেই সব শব্দে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়েও তারা ডাকতে পারে।
ইসলামের আলোক: হাদিস কী বলে?
ইসলামি শরিয়তে কুকুরের ডাকার বিষয়ে বিশেষ দিকনির্দেশনা রয়েছে। হাদিস শরিফে রাতের বেলা কুকুর ও গাধার ডাক শুনলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যখন তোমরা রাতে কুকুরের ডাক এবং গাধার চিৎকার শুনবে, তখন তোমরা আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবে (আউযুবিল্লাহ পড়বে)। কারণ তারা এমন কিছু দেখতে পায়, যা তোমরা দেখতে পাও না।” (আবু দাউদ: ৫১০৩, আহমদ: ১৪২৮৩)
ইসলামি স্কলারদের মতে, কুকুর ও গাধার দেখার ক্ষমতা মানুষের চেয়ে ভিন্ন। তারা অনেক সময় শয়তান বা অশুভ আত্মার উপস্থিতি টের পেয়ে বিচলিত হয়ে ওঠে এবং ডাকতে শুরু করে। তাই এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে মহান আল্লাহর জিকির করা এবং তাঁর কাছে নিরাপত্তা চাওয়া মুমিনের কাজ।
কুসংস্কার বনাম বাস্তবতা
আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে যে, কুকুর ডাকলে বা কাঁদলে কেউ মারা যায় কিংবা বড় কোনো বিপদ আসে। বিজ্ঞান বা ইসলাম-কোথাও এই ধরনের সুনির্দিষ্ট ধারণার ভিত্তি নেই। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয় যে, হায়াত ও মউত সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে, কোনো প্রাণীর ডাকের ওপর তা নির্ভর করে না।
রাতের বেলা কুকুরের ডাক শুনে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এটি যেমন তাদের প্রাকৃতিক স্বভাবের অংশ, তেমনি আধ্যাত্মিক দিক থেকে এটি আমাদের আল্লাহর স্মরণের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাই এমন পরিস্থিতিতে অহেতুক ভয় না পেয়ে স্বাভাবিক থাকা এবং মাসনুন দোয়া পাঠ করাই সর্বোত্তম।