মুসলিম নারীদের জন্য হজ পালন একটি ইবাদত হলেও সফর ও নিরাপত্তার স্বার্থে ইসলামি শরিয়তে ‘মাহরাম’ সঙ্গী থাকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে হজের মতো দীর্ঘ ও শ্রমসাধ্য সফরে মাহরামের উপস্থিতি নিয়ে অনেকের মনেই নানা প্রশ্ন থাকে। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী নারীর মাহরাম কারা হতে পারেন এবং এ বিষয়ে নিয়মগুলো কী, তা নিচে তুলে ধরা হলো।
মাহরাম বলতে কী বোঝায়?
ইসলামি পরিভাষায় ‘মাহরাম’ হলেন সেই সব পুরুষ, যাদের সঙ্গে কোনো নারীর বিবাহ বন্ধন চিরতরে হারাম বা নিষিদ্ধ। অর্থাৎ, যাদের সামনে একজন নারী পর্দা ছাড়াই উপস্থিত হতে পারেন এবং যাদের সঙ্গে সফর করা নিরাপদ।
হজে নারীর মাহরাম যারা হতে পারেন
নারীর মাহরামদের সাধারণত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:
১. রক্তসম্পর্কীয় মাহরাম (বংশগত):
পিতা, দাদা, পরদাদা (ঊর্ধ্বমুখী)।
ছেলে, নাতি, পুতি (নিম্নমুখী)।
ভাই (সহোদর, সৎ ভাই)।
ভাতিজা ও ভাগ্নে।
চাচা ও মামা।
২. বৈবাহিক সম্পর্কীয় মাহরাম:
স্বামী (তিনিই প্রধান মাহরাম)।
শ্বশুর (এবং শশুরের পিতা)।
নিজের মেয়ের জামাতা।
স্বামীর অন্য ঘরের সন্তান (সৎ ছেলে)।
৩. দুধসম্পর্কীয় মাহরাম:
দুধ ভাই বা দুধ পিতা (যাদের সঙ্গে দুধপানের কারণে বিয়ের সম্পর্ক হারাম হয়ে গেছে)।
মাহরামের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তাবলি
হজে সঙ্গী হিসেবে মাহরাম হতে হলে সেই পুরুষকে অবশ্যই কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে: যেমন,
মুসলিম হওয়া: মাহরামকে অবশ্যই মুসলমান হতে হবে।
প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) হওয়া: ছোট শিশু মাহরাম হিসেবে গণ্য হবে না; তাকে হজের কষ্ট ও নিরাপত্তা বোঝার মতো সক্ষম হতে হবে।
সুস্থ মস্তিষ্ক: মানসিকভাবে সুস্থ ব্যক্তিকে মাহরাম হিসেবে নিতে হবে।
মাহরাম ছাড়া নারী কি হজ করতে পারবেন?
এই বিষয়ে ইসলামি ফকিহদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে: যেমন,
হানাফি মাজহাব: হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, মক্কা থেকে সফরের দূরত্ব (প্রায় ৭৮ কিমি বা তার বেশি) হলে মাহরাম ছাড়া নারীর জন্য হজ বা যেকোনো সফর করা জায়েজ নেই। এমনকি নারী শারীরিকভাবে সক্ষম হলেও মাহরাম না থাকলে তার ওপর হজ আদায় করা আবশ্যক হয় না।
শাফি ও মালেকি মাজহাব: কিছু ফকিহর মতে, যদি হজের কাফেলা বা সফরটি অত্যন্ত নিরাপদ হয় এবং নারীদের একটি বিশ্বস্ত বড় দল থাকে, তবে ফরজ হজ আদায়ের জন্য মাহরাম ছাড়াও যাওয়া যেতে পারে। (উল্লেখ্য যে, বর্তমান সৌদি সরকার হজ ও ওমরার ক্ষেত্রে নারীদের মাহরাম ছাড়াই ভ্রমণের অনুমতি দিচ্ছে, তবে শরিয়তের মূল বিধান পালনে আলেমদের পরামর্শ নেওয়া উত্তম)।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
অনেক সময় দূর সম্পর্কের আত্মীয় বা পরিচিত কাউকে ‘পাতানো ভাই’ বা ‘পাতানো বাবা’ বানিয়ে হজে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ইসলামি শরিয়তে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মাহরাম হতে হলে অবশ্যই ওপরে উল্লিখিত রক্ত বা দুধের সম্পর্ক থাকতে হবে।
হজ একটি পবিত্র ইবাদত। এই ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে শরিয়তের নিয়মগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করা জরুরি। বিশেষ করে নারীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে একজন যোগ্য মাহরামের সাথে সফর করা ইসলামের সৌন্দর্য ও হিকমতের অংশ।