দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে ৫৬ জেলায়, বাড়ছে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, একদিনে হাম-সদৃশ উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে ৯৪৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গত ১৯ দিনে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৪ জনে। একই সময়ে ৫ হাজার ৭৯২ শিশু বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে, যার মধ্যে ১০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ৯ জনের শরীরে সরাসরি হামের জীবাণু শনাক্ত করা হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, শুরুতে জ্বর ও ঠান্ডার মতো উপসর্গ থাকলেও পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। অনেকেই প্রাথমিকভাবে বিষয়টিকে সাধারণ রোগ মনে করে অবহেলা করছেন, ফলে সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে।
দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের অভিজ্ঞতা প্রায় একই। প্রতিদিনই নতুন রোগী বাড়ছে, অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, বরগুনা, মাগুরা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় গত ১৯ দিনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মৃত্যু হয়েছে, যা অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৩০ মার্চ পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ১৯০ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৬৭৬ জনের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। কক্সবাজার, বরগুনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর জেলা উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকাকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি। এখানে আক্রান্ত ৩১৫ জন এবং উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ৩৯৪ শিশু। চট্টগ্রাম বিভাগে আক্রান্ত ১৯৯ জন, বরিশালে ৭৬ জন, খুলনায় ৮৯ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং ময়মনসিংহ বিভাগে আক্রান্ত ৪৪ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে জেলা পর্যায় থেকে ভুল তথ্য পাঠানোর কারণে মৃত্যুর তালিকা সংশোধন করা হয়েছে। অন্যদিকে নতুন করে রাজধানীর একটি হাসপাতালে একজনের মৃত্যুর তথ্য যুক্ত হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ২০ থেকে ২১টি উপজেলায় দুই সপ্তাহব্যাপী এই কার্যক্রম চলবে। এ ছাড়া দেশের সব সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক ও কর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডে ১০টি কেন্দ্রে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। আগামীকাল রোববার থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুদের টিকা দেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকাদান, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। যথাসময়ে ব্যবস্থা না নিলে হামের এই প্রাদুর্ভাব আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে।