পিরিয়ডের রক্ত বা মাসিকের রক্তকে দীর্ঘকাল ধরে কেবল শরীরের ‘বর্জ্য’ হিসেবে গণ্য করা হলেও, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন একে দেখছে সুস্থতা পরিমাপের ‘স্বর্ণখনি’ হিসেবে।
এন্ডোমেট্রিওসিস থেকে শুরু করে ডায়াবেটিস, জরায়ু ক্যান্সার, এমনকি শরীরে দূষণের মাত্রা কতটুকু—তার সবটাই এখন নিখুঁতভাবে জানা সম্ভব হচ্ছে এই রক্তের মাধ্যমে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পিরিয়ডের রক্ত আসলে নারীদেহের ভেতরের অবস্থার আয়না বা একটি ‘প্রাকৃতিক বায়োপসি’।
বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৯ কোটি নারী ‘এন্ডোমেট্রিওসিস’ নামক এক যন্ত্রণাদায়ক দীর্ঘমেয়াদী রোগে ভোগেন। এই রোগে জরায়ুর ভেতরের কোষ জরায়ুর বাইরে বাড়তে থাকে, যার ফলে তীব্র ব্যথা এবং বন্ধ্যাত্ব দেখা দেয়।
বর্তমানে এই রোগ শনাক্ত করতে ‘ল্যাপারোস্কোপি’ বা পেটে ছিদ্র করে ক্যামেরা ঢোকানোর মতো অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়। ফলে একজন নারীর সঠিক রোগ নির্ণয় হতে ৫ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘নেক্সটজেন জেন’ এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখন পিরিয়ডের রক্ত থেকে আরএনএ (RNA) ও বিশেষ প্রোটিন বিশ্লেষণের মাধ্যমে মাত্র কয়েক দিনে এই রোগ শনাক্তের সহজ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে।
কেন এই রক্ত সাধারণ রক্তের চেয়ে আলাদা?
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, পিরিয়ডের রক্ত কেবল ধমনীর রক্ত নয়। এর অর্ধেকটা সাধারণ রক্ত হলেও বাকি অর্ধেক অংশ গঠিত হয় প্রোটিন, হরমোন, ব্যাকটেরিয়া এবং জরায়ুর আস্তরণ থেকে ঝরে পড়া বিশেষ কোষ দিয়ে।
রিপ্রোডাক্টিভ বায়োলজিস্ট ক্রিস্টিন মেটজ জানান, সাধারণ বায়োপসিতে জরায়ুর একটি ছোট অংশ পরীক্ষা করা হয়, কিন্তু মাসিকের রক্তে পুরো জরায়ুর ভেতরের পরিবেশের প্রতিফলন ঘটে। এতে এমন ৩৮৫টি প্রোটিন পাওয়া গেছে যা শরীরের অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।
২০২৪ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বড় সাফল্য আসে যখন এফডিএ (FDA) প্রথমবারের মতো একটি পিরিয়ড প্যাড বা ‘কিউ-প্যাড’ অনুমোদন দেয়। এটি দিয়ে মাসিকের রক্ত সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠিয়ে দিলে রক্তে শর্করার গড় মাত্রা বা ডায়াবেটিস নির্ণয় করা সম্ভব।
এছাড়া থাইল্যান্ডে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত প্যাপ স্মিয়ার পরীক্ষার চেয়ে মাসিকের রক্ত থেকে জরায়ু মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি বা এইচপিভি ভাইরাস শনাক্ত করা অনেক বেশি কার্যকর।
পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বে মোট চিকিৎসা গবেষণার মাত্র ৫ শতাংশ ব্যয় হয় নারীদের স্বাস্থ্যের ওপর। এমনকি এন্ডোমেট্রিওসিসের চেয়ে পুরুষদের চুল পড়া বা টেকো সমস্যার গবেষণায় বেশি অর্থ খরচ করা হয়।
তবে ২০২৫ এবং ২০২৬ সালকে এই গবেষণার মোড় ঘোরানোর বছর হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমআইটি -র মতো প্রতিষ্ঠানগুলো পিরিয়ড সাইকেল নিয়ে বড় অংকের বিনিয়োগ করছে এবং ইউরোপে প্রথমবারের মতো ‘পিরিয়ড ব্লাড ব্যাংক’ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।
সূত্র : বিবিসি