বসন্তের রং লেগেছে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভাজকে। ময়মনসিংহ বিভাগের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত ময়মনসিংহ মহাসড়কের ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের মাঝখানের বিভাজকজুড়ে ফুটেছে বসস্তের হাজারো রঙিন ফুল।
বিশেষ করে বসন্তের এই সময়ে গোলাপি, লাল ও সাদা ফুলের সমারোহে পুরো সড়ক যেন এক বিশাল রঙিন গালিচায় রূপ নিয়েছে। যান্ত্রিকতার ভিড়ে ময়মনসিংহ নগরীর বাইপাস মোড় থেকে শুরু করে ত্রিশাল-ভালুকা হয়ে গাজীপুর পর্যন্ত চোখে পড়া এই দৃশ্য কেড়ে নিচ্ছে ক্লান্ত যাত্রীদের মন। এটি দুর্ঘটনা এড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় কার্বন সিঙ্ক হিসেবে কাজ করছে বলেও দাবি সড়ক ও জনপথ বিভাগের।
সম্প্রতি সরেজমিন বইলার ও ত্রিশালে দেখা যায়, অনেক পর্যটক ও শৌখিন ভ্রমণকারী এখন সড়কের নান্দনিক স্থানে গাড়ি দাঁড় করে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এতে করে ত্রিশাল ও ভালুকার মতো এলাকাগুলোর পরিচিতি যেমন বাড়ছে, তেমনি মহাসড়ককেন্দ্রিক একটি পর্যটন সম্ভাবনারও দ্বারও উন্মোচিত হচ্ছে। এক সময় মহাসড়কটি ছিল যানজট আর ধুলোবালির রাজত্ব। গত কয়েক বছরে চার লেনের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর সড়কের চিত্র আমূল বদলে গেছে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, মহাসড়কের সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে কয়েক বছর আগে কয়েক লাখ বিভিন্ন প্রজাতির শোভাবর্ধনকারী গাছ রোপণ করা হয়। নিয়মিত পরিচর্যা ও সুপরিকল্পিত ছাঁটাইয়ের ফলে গাছগুলো এখন পূর্ণতা পেয়েছে। বিশেষ করে বাগানবিলাস, করবী, কাঞ্চন ও কৃষ্ণচূড়ার সারি মহাসড়কটিকে একটি জীবন্ত সবুজ বেষ্টনীতে পরিণত করেছে।
ইউনাইটেড পরিবহনের চালক আব্দুল হালিম জানান, দীর্ঘ পথযাত্রায় একঘেয়েমি ও ক্লান্তি দূর করতে এই দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ মহৌষধ হিসেবে কাজ করছে।
ত্রিশালের স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তাক আহমেদ দাবি, এই পুষ্পশোভিত রূপ ধরে রাখতে নিয়মিত পানি দেওয়া ও রক্ষণাবেক্ষণের এই ধারা যেন সারাবছর অব্যাহত থাকে। সড়ক ও জনপথ কর্তৃপক্ষও আশ্বস্ত করেছে যে, ভবিষ্যতে এই মহাসড়ক আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তুলতে নতুন নতুন প্রজাতির গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোরাদ আহমেদ ফারুখ বলেন, দ্রুত নগরায়নের ফলে যেখানে সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের এই ‘সবুজ করিডোর’ একটি আদর্শ মডেল হতে পারে। এটি কেবল বায়ুদূষণ রোধ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করছে না, বরং একটি পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ময়মনসিংহ সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলী খায়রুল বাশার মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন বলেন, ৭ বছর আগের এই পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ কেবল সৌন্দর্যের জন্যই নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর কারিগরি ও পরিবেশগত কারণ। মহাসড়কের মাঝখানে থাকা এই ঘন সবুজ ঝোপ ও ফুলের সারি রাতের বেলায় বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন হেডলাইটের তীব্র আলো থেকে চালকদের রক্ষা করে। এতে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে। এ ছাড়া দ্রুতগতির যানবাহনে কালো ধোঁয়া ও কার্বন নিঃসরণ শোষণে এই লক্ষাধিক গাছ ‘কার্বন সিঙ্ক’ হিসেবে কাজ করছে, যা স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও বড় ভূমিকা রাখছে।