পবিত্র রমজান মাসে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলমান সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোতে গ্রীষ্মকালে রোজা পড়ায় অনেক জায়গায় ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় রোজা রাখতে হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, টানা এক মাস রোজা রাখলে শরীরে কী পরিবর্তন ঘটে?
প্রথম কয়েক দিন সবচেয়ে কষ্টকর সময়
শেষবার খাবার গ্রহণের প্রায় আট ঘণ্টা পর শরীর প্রকৃত অর্থে উপোসের পর্যায়ে প্রবেশ করে। এর আগ পর্যন্ত পাকস্থলী খাবার হজম ও পুষ্টি শোষণের কাজ সম্পন্ন করে।
খাদ্য হজম হয়ে গেলে শরীর যকৃৎ ও মাংসপেশিতে সঞ্চিত গ্লুকোজ থেকে শক্তি নিতে শুরু করে। পরে শক্তির উৎস হিসেবে চর্বি ব্যবহৃত হয়। এতে ওজন কমতে পারে, কোলেস্টেরল হ্রাস পেতে পারে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমতে সহায়তা করে।
তবে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে গেলে দুর্বলতা, ঝিমুনি, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা বা বমিভাব দেখা দিতে পারে। কারও কারও নিশ্বাসে দুর্গন্ধও হতে পারে। এ সময় ক্ষুধা বেশি অনুভূত হয়।
৩ থেকে ৭ রোজা, পানিশূন্যতার ঝুঁকি
প্রথম কয়েক দিন পর শরীর রোজার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করে। চর্বি ভেঙে শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়।
তবে দিনের বেলায় পানি পান করা যায় না বলে ইফতার ও সেহরিতে পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় পানিশূন্যতার ঝুঁকি তৈরি হয়, বিশেষ করে গরমে ঘাম হলে।
খাবারে কার্বোহাইড্রেট, স্বাস্থ্যকর চর্বি, প্রোটিন, লবণ ও পর্যাপ্ত তরল থাকতে হবে। সুষম খাদ্যাভ্যাস রোজার সময় সুস্থ থাকতে সহায়ক।
৮ থেকে ১৫ রোজা, শরীরের অভিযোজন
এই পর্যায়ে শরীর রোজার সঙ্গে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানিয়ে নেয়। অনেকেই শারীরিক ও মানসিক স্বস্তি অনুভব করেন।
Addenbrooke’s Hospital-এর অ্যানেশথেসিয়া ও ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের কনসালট্যান্ট ড. রাজিন মাহরুফ বলেন, দৈনন্দিন জীবনে অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণের ফলে শরীরের স্বাভাবিক কিছু প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। রোজার সময় শরীর নিজেকে পুনর্গঠনের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারে, যা সংক্রমণ প্রতিরোধ ও কোষ মেরামতে সহায়ক হতে পারে।
১৬ থেকে ৩০ রোজা, ভারমুক্ত অনুভূতি
রমজানের দ্বিতীয়ার্ধে শরীর পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে যায়। পাচনতন্ত্র, যকৃৎ ও কিডনি কার্যক্রমে ভারসাম্য ফিরে পায়। অনেকেই এ সময় মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির উন্নতি লক্ষ্য করেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় একটানা উপোস থাকলে শরীর শক্তির জন্য মাংসপেশী ব্যবহার করতে শুরু করতে পারে। যদিও রমজানে দিনের বেলায় রোজা রেখে রাতে খাবার গ্রহণের সুযোগ থাকায় সাধারণত এ ঝুঁকি কম থাকে।
রোজা কি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোজা উপকারী হতে পারে যদি সঠিকভাবে সুষম খাদ্য ও পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ করা হয়। এটি খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
তবে ওজন কমানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি একটানা উপোস স্বাস্থ্যসম্মত নয়। কারণ, একসময় শরীর চর্বি ভাঙার পরিবর্তে মাংসপেশি ক্ষয় করতে পারে।
রমজান শেষে অনেকে নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, যেমন ৫:২ ডায়েট অনুসরণ করতে পারেন, যেখানে সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে কম ক্যালরি গ্রহণ করা হয়। তবে যেকোনো খাদ্যনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।