বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:৩৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
৯৩ আসনে ট্রাক প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে গণঅধিকার পরিষদ জাতিসংঘ সংস্থার সদর দপ্তর গুঁড়িয়ে দিল ইসরায়েল বিএনপিতে যোগ দিলেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী প্রস্তাবিত ২০ গ্রেডের নতুন সরকারি বেতন স্কেল দেখে নিন ইবির দুর্নীতি ও অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপির ৫৯ নেতাকে বহিষ্কার দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ২৩ বছরের কারাদণ্ড নির্বাচন ও নিরাপত্তা নিয়ে সেনাপ্রধানের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রধান উপদেষ্টার কাছে ‘নবম জাতীয় বেতন কমিশন’ প্রতিবেদন পেশ বরিশালে চূড়ান্ত লড়াইয়ে ৩৬ প্রার্থী, পেলেন প্রতীক বরাদ্দ

নীলফামারীতে জামায়াত-বিএনপির কঠিন হিসাব

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২৬

উত্তরের সীমান্ত ঘেঁষা জেলা নীলফামারীতে পুরোদমে বইছে নির্বাচনি হাওয়া। ভোটের মাঠে মরিয়া হয়ে উঠেছেন জামায়াত-বিএনপির প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। ভোটের মাঠে জাতীয় পার্টিকে দেখা গেলেও প্রচারে কিছুটা নিষ্ক্রিয়। তবে দিন-রাত এক করে চলছে বিএনপি-জামায়াতের প্রচার-প্রচারণা। নেতা-কর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে ভোটারদের সামনে তুলে ধরছেন উন্নয়ন পরিকল্পনা, অতীতের বঞ্চনা এবং রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।

এ নির্বাচনি উত্তাপে মুখর হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের জীবনও। হাট-বাজার, মাঠ-ঘাট, চায়ের দোকান কিংবা মোড়ে সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন নির্বাচন। জেলার চারটি সংসদীয় আসনের হাট, বাজার, শহরজুড়ে ভোটের হিসাব-নিকাশ নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। ভোটাররা বলছেন, দল নয়, যোগ্যতা, সততা ও গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দিয়েই তারা এবার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।

অনেক আগেই জামায়াত চার আসনে প্রার্থী নির্বাচন করেছেন। তবে চারটি আসনের মধ্যে বিএনপির একটিতে রয়েছে জোটের প্রার্থী। তবে যেসব আসনে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে, সেখানেও দেখা দিয়েছে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও আন্দোলন। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে হারানো ঘাঁটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ প্রচারে নেমেছে জামায়াতে ইসলামী।

২০০৮ সালে জোটবদ্ধ নির্বাচন করে জেলার আসন চারটি সমান ভাগে ভাগ করে নেয় আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টির মহাজোট। গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে আরও কোনঠাসা হয়ে পড়ার পরও চারটির মধ্যে তিনটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে জাতীয় পার্টি।

ছয় উপজেলার এ জেলায় রয়েছে ৬০টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভা। এরমধ্যে প্রথম শ্রেণির পৌরসভা রয়েছে দুটি। জেলা শহর ছাড়াও রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা শহর। এ জেলার মোট ভোটার সংখ্যা ১৫ লাখ ৭৭ হাজার ৭৩৮ জন। এর মধ্যে নারী ৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৭৩, পুরুষ ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫৪ জন এবং হিজরা ১১ জন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটারসংখ্যা ছিল ১৪ লাখ ৮৯ হাজার ৬৭০ জন।

নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা): সীমান্তবর্তী ডোমার ও ডিমলা উপজেলা নিয়ে এ আসন গঠিত। দুই উপজেলার ২০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ভোটারসংখ্যা ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৯৮৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩০ হাজার ২৫৯, নারী ২ লাখ ২৫ হাজার ৭২৫ এবং হিজরা ২জন। এই আসনে আওয়ামী লীগ ৪বার, জাতীয় পার্টি ৩বার ও বিএনপি ১ বার বিজয়ী হয়। জাতীয় পার্টি কিংবা আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই এখানে বিজয়ী হয়ে আসছিছেন। এবার আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ও জাতীয় পার্টির নিষ্ক্রিয়তায় আসনটি দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী জেলা আমির অধ্যক্ষ আবদুস সাত্তার। জামায়াতের সঙ্গে আন্দোলনরত অন্যান্য দলগুলোর সমর্থনে ভোটের মাঠে তাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে বলে জানান আবদুস সাত্তার।

অপরদিকে, এই আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়ার বড় বোনের ছেলে প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন। তিনি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি জোটের শরিকদল জমিয়তে উলাময়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দিকে এই আসনে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। এরপরই বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে শুরু হয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় নেতাকর্মী ও তুহিন সমর্থকরা আগুন জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ ও মিছিল করেন। ফলে জোটের প্রার্থীর সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে বিএনপি নেতাকর্মীদের। এ বিষয়ে মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি বলেন, ‘আমি শতভাগ আশাবাদী এ আসন থেকে জনগণ আমাকে নির্বাচিত করবেন। নির্বাচিত হলে একটি সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে আমি আন্তরিকভাবে কাজ করব।’

এ ছাড়া ভোটের মাঠে জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী তছলিম উদ্দিন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. আব্দুল জলিলসহ আরও কিছু দলের প্রার্থী রয়েছে।

 

নীলফামারী-২ (সদর): এ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন এবং একটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভা নিয়ে এ আসনটি গঠিত। আসনটির ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮২ হাজার ৩৫১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯১ হাজার ২৮৭ জন, নারী ১ লাখ ৯১ হাজার ৬২ এবং হিজরা ২ জন। এ আসনটি জেলার গুরুত্বপূর্ণ একটি আসন। এ আসনে আওয়ামী লীগ ৫ বার, জাতীয় পার্টির ২ বার, কমিউনিস্ট পার্টি ১ বার ও বিএনপির ১ বার বিজয়ী হয়।

বিএনপি মনোনীত সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় নাম ছিল জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এএইচএম সাইফুল্লাহ রুবেলের। অনেকদিন থেকেই নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ মুহুর্তে করা হয় প্রার্থী পরিবর্তন। মনোনয়ন পান বেগম খালেদা জিয়ার বড় বোনের ছেলে প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন। শহর, হাট, বাজার, পাড়া, মহল্লায় প্রতিটি ভোটারের কাছে গিয়ে ধানের শীষে ভোট চাচ্ছেন তুহিন ও বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি, এ আসনটি আমাদের বিএনপির ঘাটি। যত পরিশ্রমই হোক এ আসনে বিএনপির বিজয়ী হতে হবে। নেতাকর্মীরা ঘরে বসে নেই।

 

এদিকে, তারেক রহমানের খালাতো ভাই তুহিন চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়ায় এই আসনে কিছুটা কোনঠাসা হয়ে পড়েছে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ও জেলা বারের সভাপতি আলফারুক আব্দুল লতিফ। তুহিন ফটোকপি মনোনয়নপত্র দাখিল করেছে দাবি করে জামায়াতের সমর্থকরা জেলা রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিলও করে। তবে আসনটি জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। অতীতে আওয়ামী লীগকে এখানে বারবার জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে কঠিন লড়াই করতে হয়েছে।

 

বর্তমানে আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় পুরোনো অবস্থান পুনরুদ্ধারে তৎপর জামায়াত। চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে জামায়াত তাদের ঘাটি উদ্ধার করবে বলে জানান আলফারুক আব্দুল লতিফ। এদিকে, এই আসনে প্রার্থী দেয়নি জাতীয় পার্টি। অপরদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম ও খেলাফত মজলিসের প্রার্থী সরোয়ারুল আলমও রয়েছেন ভোটের মাঠে।

 

নীলফামারী-৩ (জলঢাকা): জলঢাকা উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন এবং ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ আসন। ভোটার সংখ্য ২ লাখ ৯১ হাজার ৭৯১জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪০ জন, নারী ১ লাখ ৪৩ হাজার ২৬৫ এবং হিজরা ২ জন। এই আসনে জামায়াতে ইসলামী ৩বার, জাতীয় পার্টি ৩ বার, আওয়ামী লীগ ২ বার ও বিএনপি ১ বার বিজয়ী হন। ‘১৯৮৬ থেকে ২০০১ সালের নির্বাচনে আসনটি জামায়াতের দখলে ছিল। এরপর থেকে এলাকাটি পরিচিত হয় জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে। সেটি ২০০৮ সালে হাতছাড়া হয় আওয়ামী লীগের মহাজোটের কাছে। মহাজোটের জোরে সেবার নির্বাচিত হন জাতীয় পাটির প্রার্থী। হারানো আসন উদ্ধারে এবার রংপুর মহানগর জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি ও জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ ওবায়দুল্লাহ্ সালাফীকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি।

 

এদিকে, জামায়াতের ঘাঁটিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে কঠোর অবস্থানে বিএনপির নেতাকর্মী। জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ও দু’বারের উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দ আলী পেয়েছেন বিএনপির মনোনয়ন। ভোটের মাঠে সক্রিয় হয়ে ইউনিয়ন ভিত্তিক উঠান বৈঠক, সভা ও সেমিনারের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছেন। জামায়াতের ঘাটিতে এবার বিএনপির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হবে বলে দাবি স্থানীয় ভোটারের।

এই আসনে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পান রোহান চৌধুরী। কিন্তু মনোনয়নপত্র যাছাই-বাছাইয়ে উত্তীর্ণ হতে পারেন নি তিনি। বাতিল হয় তার মনোনয়নপত্র।

নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ): জেলার সৈয়দপুর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন ও একটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভা এবং কিশোরগঞ্জ উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসন। মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৬১০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ২৪ হাজার ৪৮৪, নারী ২ লাখ ২৩ হাজার ১২১ এবং হিজরা ৫ জন। এই আসনে জাতীয় পার্টি ৫ বার, বিএনপি ২ বার, আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ ১ বার বিজয়ী হয়। এই আসনে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যক্ষ আবদুল গফুর সরকার। ঘোষণার পরপরই দলটির নেতাকর্মীদের একাংশ তার প্রার্থিতা বাতিলের দাবিতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।

 

এই বিভাজনের সুযোগ নিচ্ছে জামায়াত। দলটি সৈয়দপুর উপজেলা আমির হাফেজ আবদুল মোনতাকিমকে প্রার্থী করেছে। অবাঙালি অধ্যুষিত এ আসনে বিহারি ভোটের বড় অংশ দাঁড়িপালায় যেতে পারে বলেও দাবি নেতাকর্মীদের।

 

তবে এই আসনের আরেক হেভিওয়েট প্রার্থী জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী সিদ্দিকুল আলম। জনগণের কাছেও রয়েছে তার গ্রহণযোগ্যতা। গত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ভোটারদের দাবি, ভোটের মাঠে সিদ্দিকুল আলমের সঙ্গে তীব্র লড়াই করে এই আসনে জামায়াত-বিএনপির প্রার্থীদেরকে জিততে হবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102