গাজীপুরে চাঁদাবাজির একটি মামলায় রিমান্ডে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রিমান্ড আদেশ বাতিল করে জামিন পেয়েছেন জুলাই যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত তাহরিমা জান্নাত সুরভী (১৭)। সোমবার (৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-১-এর বিচারক অমিত কুমার দে তার চার সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেন।
এর আগে একই দিন দুপুরে গাজীপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক সৈয়দ ফজলুল মহাদি একটি চাঁদাবাজির মামলায় সুরভীর দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন। এই আদেশের পরই আদালত প্রাঙ্গণে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সুরভীর বয়স ১৮ বছরের নিচে দাবি করে জুলাই যোদ্ধা, ছাত্র ও শ্রমিকদের একটি অংশ বিক্ষোভ শুরু করেন।
রিমান্ড আদেশের পর গারদখানা থেকে প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় সুরভী উচ্চৈস্বরে অভিযোগ করেন, কোনো তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়াই তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক একজন কিশোরীকে রিমান্ডে নেওয়ার ঘটনায় আইনগত ও মানবিক দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকেই।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষিতে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ফেসবুকে এক পোস্টে জানান, তিনি বিষয়টি খোঁজ নিয়েছেন এবং দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার আশ্বাস দেন।
সুরভীর আইনজীবী ও গাজীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান কামাল জানান, ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের রিমান্ড আদেশের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত আসামির বয়স, মামলার প্রেক্ষাপট ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে রিমান্ড আদেশ বাতিল করেন এবং তার জিম্মায় চার সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন।
এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কালিয়াকৈর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ওমর ফারুক পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করলেও আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন।
গত ২৪ ডিসেম্বর দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী এলাকায় নিজ বাসা থেকে যৌথ বাহিনীর অভিযানে সুরভীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। ওই সময় পুলিশের সঙ্গে কয়েকজন সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। ঘুমন্ত অবস্থায় গ্রেপ্তারের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।
পুলিশ জানায়, সাংবাদিক নাইমুর রহমান দুর্জয়ের করা একটি চাঁদাবাজির মামলায় সুরভী পরোয়ানাভুক্ত আসামি। এজাহার অনুযায়ী, ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে কালিয়াকৈর থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলার নথিতে সুরভীর বয়স ২১ বছর উল্লেখ থাকলেও পরিবার ও আইনজীবীদের দাবি, তার প্রকৃত বয়স প্রায় ১৭ বছর ১ মাস।
বাদী নাইমুর রহমান দুর্জয় নিজেকে একটি জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে সুরভীর সঙ্গে অনৈতিক প্রস্তাবের অভিযোগ ওঠে। অনেক জুলাই যোদ্ধার দাবি, ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সুরভীকে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
সোমবার সকালে সুরভীকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হলে জজ কোর্ট প্রাঙ্গণে জুলাই যোদ্ধাদের বড় একটি অংশ জড়ো হন। তারা রিমান্ড বাতিল ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে স্লোগান দেন। বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও গভীর রাতে তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, যা আইন ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থি।
আন্দোলনে অংশ নিয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক ও গাজীপুর-২ আসনের মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আলী নাসের খান বলেন, সুরভীর সঙ্গে যা হয়েছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই দ্রুত এই ভুল সংশোধন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ওমর ফারুক বলেন, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বয়স সংক্রান্ত তথ্য আদালতে উপস্থাপন করা হবে। তবে গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও বয়স যাচাই না হওয়া নিয়ে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাসির উদ্দিন বলেন, এজাহারে বয়স ২১ বছর উল্লেখ থাকায় শুরুতে আলাদা যাচাই করা হয়নি। বিতর্কের পর পরিবারের কাছ থেকে জন্মনিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করে অনলাইনে যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শরীফ উদ্দিন জানান, মামলাটি তার দায়িত্ব নেওয়ার আগের হলেও তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন এবং কোনো ধরনের অবিচার যেন না হয়, সে বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে নজর রাখবেন।
উল্লেখ্য, রিমান্ড বাতিল ও জামিনের মধ্য দিয়ে আপাতত মুক্তি পেলেও মামলাটি ঘিরে বয়স, গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া এবং অভিযোগের সত্যতা নিয়ে আলোচনা ও আইনি লড়াই এখনো চলমান।