চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ১ নম্বর সৈয়দপুর ইউনিয়নের পশ্চিম সৈয়দপুর ৬ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় ৮০ বছরের পুরোনো একটি সুইচগেট চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ছয়টি নাশিযুক্ত সুইচগেটটির দুটি নাশি পুরোপুরি ভেঙে গেছে। আরেকটি নাশিও রয়েছে ভাঙনের মুখে।
এরই মধ্যে জোয়ারের পানির প্রবল স্রোতে সুইচগেট সংলগ্ন উপকূল রক্ষা বেড়িবাঁধের প্রায় ৪০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩০ ফুট প্রস্থের একটি অংশ ধসে গেছে। এতে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের পুরোনো সুইচগেটটি বিভিন্ন সময়ে সাময়িক সংস্কারের মাধ্যমে সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও বর্তমানে ছয়টি নাশির মধ্যে দুটি সম্পূর্ণ অকেজো। আরেকটি নাশিও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। একই সঙ্গে জোয়ারের পানির আঘাতে বেড়িবাঁধের বড় একটি অংশ ধসে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে সুইচগেটটির দুটি নাশি ভাঙা। ফলে জোয়ারের পানি নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হচ্ছে। অতিরিক্ত জোয়ারের সময় পানির প্রবল চাপ সুইচগেট ও বেড়িবাঁধের ওপর পড়ায় ভাঙন আরও বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সর্বশেষ নাশি প্রতিস্থাপনের সময় নির্মাণ করা গাইডওয়াল প্রয়োজনের তুলনায় নিচু হওয়ায় অতিরিক্ত জোয়ারের পানি তা উপচে বেড়িবাঁধের মাটিতে আছড়ে পড়ে। এতে ধীরে ধীরে বাঁধের মাটি ক্ষয় হয়ে দুর্বল হয়ে যায়। এক পর্যায়ে জোয়ারের পানির চাপে প্রায় ৪০×৩০ ফুট অংশ ভেঙে পড়ে।
সৈয়দপুর ইউনিয়ন কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক এমাম হোসেন বলেন, সুইচগেটটির সুবিধাভোগী পশ্চিম সৈয়দপুরসহ আশপাশের এলাকায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষের বসবাস। তাঁদের অধিকাংশই কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সুইচগেট ও বেড়িবাঁধ স্থায়ীভাবে সংস্কার না হলে জোয়ারের পানি ঢুকে কৃষিজমি ও বসতবাড়ি প্লাবিত হতে পারে। এতে হাজার হাজার কৃষকের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বারবার সংস্কার, স্থায়ী সমাধান নেই
সৈয়দপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বোরহান উদ্দিন বলেন, এর আগেও সুইচগেটটির বিভিন্ন অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছিল। তখন সাময়িকভাবে মেরামত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। কিন্তু স্থায়ী সংস্কার না হওয়ায় একই স্থানে বারবার ভাঙন দেখা দিচ্ছে। বর্তমানে বেড়িবাঁধের বড় অংশ ভেঙে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শীতকালেই স্থায়ী সংস্কারের পরিকল্পনা এ বিষয়ে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সৈয়দ আরশাদ আলী বলেন, তাদের প্রতিনিধিরা সরেজমিনে সুইচগেটটি পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনে ছয়টি নাশির মধ্যে দুটি সম্পূর্ণ ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি দেখা গেছে। এর আগেও ওই স্থানে একাধিকবার ভাঙন দেখা দিয়েছিল এবং তখন সাময়িকভাবে মেরামত করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, একই স্থানে বারবার ভাঙন হওয়ায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সুইচগেটের ভেঙে যাওয়া অংশ পুরোপুরি অপসারণ করে নতুন করে স্থায়ীভাবে নির্মাণ করতে হবে। তবে এ কাজের জন্য পানির চাপ কম থাকা প্রয়োজন। তাই শীতকাল ছাড়া স্থায়ী সংস্কারের কাজ করা সম্ভব নয়।
সীতাকুণ্ডে নেই নিয়মিত প্রকৌশলী অফিস।এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন-সংশ্লিষ্ট একজন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ও একজন সহকারী প্রকৌশলীর পদ থাকলেও তারা নিয়মিত সীতাকুণ্ড অফিসে বসেন না। ফলে বেড়িবাঁধ ও সুইচগেটসহ স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা দ্রুত প্রকৌশলীদের নজরে আনা ও তদারকি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সৈয়দ আরশাদ আলী বলেন, সীতাকুণ্ড অফিসে কর্মকর্তাদের বসার জন্য কোনো অফিস সেটআপ নেই। পূর্বাপর কোনো কর্মকর্তাই সীতাকুণ্ডে নিয়মিত অফিস করেননি। তারা চট্টগ্রাম শহরে বসেই দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। সীতাকুণ্ডে থাকা স্থাপনাটি মূলত একটি গেস্টহাউস।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, শীতকাল পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আপাতত বেড়িবাঁধের ভাঙা অংশ রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সুইচগেটের ক্ষতিগ্রস্ত নাশিগুলো দ্রুত সংস্কার এবং শুষ্ক মৌসুমে পুরো সুইচগেটটি স্থায়ীভাবে পুনর্নির্মাণ করতে হবে।
তাদের আশঙ্কা, বড় ধরনের জোয়ার, ঘূর্ণিঝড় বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানলে বর্তমানে ভেঙে যাওয়া ৪০×৩০ ফুট অংশ দিয়ে পানি ঢুকে ভাঙন আরও বিস্তৃত হতে পারে। এতে কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও মানুষের জীবন-জীবিকা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা ও কৃষিজমি রক্ষায় দ্রুত সুইচগেট ও বেড়িবাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে ভাঙা অংশ সুরক্ষিত করার পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ৮০ বছরের পুরোনো সুইচগেটটি স্থায়ীভাবে পুনর্নির্মাণ করা হলে ভবিষ্যতে জোয়ারের পানির চাপ ও উপকূলীয় ভাঙন থেকে এলাকাটি অনেকটাই সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে।