জামালপুর সদর উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নের গোদাশিমলা গ্রামের বাসিন্দা আরমান রফিকুল ইসলামের ছেলে। পরিবারের তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তার স্ত্রী ও পাঁচ মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। গত ৭ মে রাশিয়ায় যাওয়ার পর থেকেই তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত অবস্থায় রয়েছেন বলে পরিবার জানিয়েছে।
আরমানের বাড়িতে এখন উদ্বেগ আর অপেক্ষার প্রহর। স্বজনদের মুখে হাসি নেই, আছে শুধু উৎকণ্ঠা। যুদ্ধশিবিরে আটকে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরাও খোঁজ নিতে ভিড় করছেন। এদিকে বাবার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা না জেনেই ঘরে দোলনায় সময় কাটাচ্ছে তার পাঁচ মাস বয়সী সন্তান।
মা রেখা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সংসারের অভাব ঘোচাতে ছেলে বিদেশে গিয়েছিল। এখন প্রতিদিন তার একটাই প্রত্যাশা ছেলের একটি ফোনকল। তিনি ছেলেকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ায় যাওয়ার পর প্রথম দিকে আরমানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। পরে ২৬ মে তিনি ফোন করে জানান, তাকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে দেওয়া হয়েছে এবং তিনি সীমান্তবর্তী একটি যুদ্ধশিবিরে অবস্থান করছেন। সেই সময় তিনি বাঁচার আকুতি জানিয়ে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেন। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।
কিছুদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে সেনা পোশাকে আরমানকে দেখা যায়। সেখানে তিনি দাবি করেন, তার সঙ্গে প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশি একই উদ্দেশ্যে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের অন্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং পরে যুদ্ধের কাজে নিয়োজিত করা হয়।
ভিডিওতে আরমান জানান, সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণের পর তাদের কয়েকটি দলে ভাগ করে বিভিন্ন ক্যাম্পে পাঠানো হয়। সেখান থেকে কিছুজনকে সরাসরি যুদ্ধের সামনের সারিতে পাঠানো হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফ্রন্টলাইনের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। মাইন, গ্রেনেড ও ড্রোন হামলার ঝুঁকির মধ্যে তাদের কাজ করতে হয়েছে। তিনি দাবি করেন, তাদের দলের ১৬ জনের মধ্যে ১২ জন নিহত হয়েছেন এবং জীবিতদের কয়েকজন আহত অবস্থায় রয়েছেন। আরমান নিজেও হাতে আঘাত পেয়েছেন বলে জানান।
ভিডিওর আরেক অংশে তিনি বলেন, বর্তমানে তারা একটি ক্যাম্পে অবস্থান করছেন এবং যেকোনো সময় আবার যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হতে পারে। ভাষাগত সমস্যার কারণে নিজেদের অবস্থার কথা ঠিকভাবে প্রকাশ করাও সম্ভব হচ্ছে না। তার অভিযোগ, যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে অনীহা প্রকাশ করলে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
আবেগঘন বার্তায় আরমান বলেন, তাদের অধিকাংশের পরিবার ও ছোট সন্তান রয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ করার জন্য তারা বিদেশে যাননি; বরং জীবিকা নির্বাহের আশায় রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। এখন তারা নিরাপদে দেশে ফেরার সুযোগ চান।
আরমানের বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, ভালো চাকরির আশায় তার ছেলে রাশিয়ায় গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে এমন পরিস্থিতিতে পড়বে, তা কেউ কল্পনাও করেননি। তিনি সরকারের কাছে ছেলেকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
ছোট ভাই সালমান জানান, আরমান এর আগে কয়েক বছর ইরাকে কাজ করেছেন। দেশে ফিরে দীর্ঘদিন কর্মসংস্থানের অভাবে ছিলেন। সংসারের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়েই আবার বিদেশে যান। কিন্তু এখন তিনি কোথায় আছেন, কী অবস্থায় আছেন, এমনকি জীবিত আছেন কি না সেই তথ্যও পরিবারের কাছে নেই। পরিবারের একমাত্র চাওয়া, আরমান যেন নিরাপদে নিজের দেশে ফিরে আসতে পারেন।







