সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ০১:৩৮ পূর্বাহ্ন

ভারতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া ‘তেলাপোকা’ বিদ্রোহে কেন ঘুম হারাম মোদি সরকারের?

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

ভারতে আচমকাই রাজনৈতিক দৃশ্যপটের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে একটি নতুন নাম—‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে আত্মপ্রকাশ করা এই সংগঠনটি ইতিমধ্যেই ভারতের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। শিক্ষা ব্যবস্থার চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই ‘তেলাপোকাদের বিদ্রোহ’ একদিকে যেমন মোদি সরকারের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে, অন্যদিকে ভারতের বৃহত্তম সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও রণকৌশল নিয়েও নতুন এক সমীকরণ জন্ম দিয়েছে।

আন্দোলনটির নামকরণের পেছনে রয়েছে একটি বিতর্কিত প্রেক্ষাপট। বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা’ হিসেবে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্তের মন্তব্যকে প্রতীকী অস্ত্র হিসেবে বেছে নেন দলিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং বোস্টন প্রবাসী তরুণ অভিজিৎ দিপকে। তিনি গঠন করেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।সিজেপি-র তাৎক্ষণিক দাবি হলো ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। সাম্প্রতিক সময়ে সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন এবং ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (নিট) পরীক্ষায় বড় ধরনের কেলেঙ্কারি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর এই দাবি আরও জোরালো হয়েছে।মাত্র কয়েক দিনেই ইনস্টাগ্রামে ২২ মিলিয়ন (২ কোটি ২০ লাখ) ফলোয়ার সংগ্রহ করে সিজেপি তাদের শক্তির জানান দিয়েছে। দিল্লিতে যন্তর মন্তরে একটি বড় ধরনের গণবিক্ষোভের পরিকল্পনা করছে তারা। বিশ্লেষকদের মতে, ২০১১ সালে আন্না হাজারের ‘ইন্ডিয়া অ্যাগেইনস্ট করাপশন’ (আইএসি) আন্দোলনের পর এটিই তরুণদের সবচেয়ে বড় স্বতঃস্ফূর্ত জনজোয়ার।

মোদি সরকার এই আন্দোলনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ও উদ্বেগের চোখে দেখছে। ইতিমধ্যেই ভারতে এই সংগঠনের ‘এক্স’ (টুইটার) অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে দিল্লিতে নামলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকারের এই মারমুখী প্রতিক্রিয়ার পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক শিক্ষা। ২০১৪ সালে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে আন্না হাজারের আন্দোলন যেভাবে পথ তৈরি করেছিল, মোদি খুব ভালো করেই জানেন এই ধরনের নাগরিক আন্দোলনের ক্ষমতা কতটা। তদুপরি, প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্মের সফল গণঅভ্যুত্থান দিল্লির নীতিনির্ধারকদের আরও বেশি সতর্ক করে তুলেছে।রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন উঠেছে যে, সিজেপি আসলে আম আদমি পার্টির (আপ) একটি গোপন ফ্রন্ট। এর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকলেও, আন্দোলনটি যদি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তবে তা কেবল কংগ্রেস বা ‘ইন্ডিয়া’ জোটকেই নয়, বরং পুরো বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণকে চ্যালেঞ্জ করে একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। ইতিমধ্যেই লাদাখের জনপ্রিয় নেতা সোনম ওয়াংচুক এই আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন, যা সিজেপি-র গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এদিকে, ককরোচ আন্দোলনের এই জোয়ারের মুখে ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি গভীর এবং মনস্তাত্ত্বিক বিতর্ক শুরু হয়েছে‌। সংবাদমাধ্যম দ্য অবজারভার পোস্ট-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে এই দ্বিধার চিত্রটি ফুটে উঠেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক সংঘাত ও প্রতিবাদের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে যেভাবে কঠোর রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও আইনি পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, তাতে মুসলিম অ্যাক্টিভিস্টদের একটি বড় অংশ সাধারণ মুসলিমদের এই আন্দোলন থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের মতে, অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি এড়াতে রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তাই এখন সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প।তবে এই ‘নিরাপদ দূরত্ব’ বজায় রাখার নীতির বিরুদ্ধে তীব্র দ্বিমত পোষণ করছেন অনেক বুদ্ধিজীবী। বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য পরিণতির ভয়ে বারবার জনআন্দোলন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিলে মুসলিমরা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন ও প্রান্তিক হয়ে পড়বে। মাঠ ছেড়ে দিলে সেই শূন্যস্থান অন্য কেউ দখল করবে এবং শিক্ষা, নাগরিক অধিকার ও জননীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মুসলিমদের কোনো কণ্ঠস্বর থাকবে না।

মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা এই সংকট উত্তরণে ‘কৌশলগত রাজনৈতিক অংশগ্রহণ’-এর ওপর জোর দিচ্ছেন, যার ভিত্তি রয়েছে ভারতীয় এবং ইসলামিক উভয় ইতিহাসেই।

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের পর মারাত্মক বিপর্যয় সত্ত্বেও মুসলিমরা সমাজ থেকে গুটিয়ে যায়নি। তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, সংবাদপত্রের মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই চালিয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামেও মুসলিমরা নিষ্ক্রিয় না থেকে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিজেদের উপস্থিতি বজায় রেখেছিল।মক্কার তেরো বছরের চরম নির্যাতন ও সামাজিক বয়কটের মুখেও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। তিনি কৌশলগত হিজরত করেছেন, বিভিন্ন গোত্রের সাথে জোট গঠনে আলোচনা চালিয়েছেন এবং মদিনায় গিয়ে ‘মদিনার সনদ’-এর মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশীদার হয়েছেন। এমনকি ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ শিখিয়েছে যে দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের জন্য সাময়িক পিছু হটা বা কৌশলগত হিসাব-নিকাশ কতটা জরুরি।

সমালোচকদের মতে, বর্তমানে মুসলিমদের সামনে একটি কৃত্রিম বা ভুল পছন্দ ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে: হয় অন্ধের মতো প্রতিটি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ো, না হয় ভয়ের কারণে পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যাও। এই দুটি পথই আত্মঘাতী। অন্ধ আন্দোলন যেমন বিপদ ডেকে আনে, তেমনি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়তা রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলে।

“রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া না হওয়াটা প্রশ্ন নয়; প্রশ্ন হলো কীভাবে যুক্ত হওয়া হবে। রাজনৈতিক অংশগ্রহণ হতে হবে নীতিগত, নির্বাচনী এবং কৌশলগত।”তাই ককরোচ আন্দোলনের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—ভয়কে স্থায়ী রাজনৈতিক দর্শন না বানিয়ে প্রতিটি আন্দোলনের নেতৃত্ব, উদ্দেশ্য ও দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল মূল্যায়ন করতে হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ককরোচ জনতা পার্টির এই আকস্মিক উত্থান ভারতের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি কি আন্না হাজারের আন্দোলনের মতো কোনো বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ইঙ্গিত, নাকি নিছক একটি ক্ষণস্থায়ী সোশ্যাল মিডিয়া ‘মিম’—তা সময়ই বলে দেবে। তবে এই আন্দোলন ভারতের মোদি সরকারকে যেমন স্নায়ুচাপে রেখেছে, তেমনই ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়কে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক কার্যপদ্ধতি ও অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে আবেগতাড়িত না হয়ে প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও কৌশলগতভাবে অংশগ্রহণের এক নতুন বার্তা দিচ্ছে। কারণ, ইতিহাস সাক্ষী—যারা জনজীবন থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়, ভবিষ্যৎ কখনোই তাদের দ্বারা গঠিত হয় না।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102