নির্বাচনে হারের প্রায় এক মাস পর রাজনৈতিক মঞ্চে ফিরে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক ইস্যুতে সরব হন মমতা। সেই সঙ্গে নাম উল্লেখ না করেই বাংলাদেশের ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদি হত্যার বিষয়টিও সামনে এনে নতুন বিতর্কের জন্ম দেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী।
ভোট-পরবর্তী সহিংসতা, পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ, নিট পরীক্ষায় অনিয়ম এবং বিজেপি সরকারের প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির প্রতিবাদে কলকাতার ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে আয়োজিত ধর্না কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখছিলেন তিনি।
সেখানে মমতা দাবি করেন, হাদি হত্যা মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) গ্রেপ্তার করেছিল। এরপরই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে ফোন পান তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি জনসমক্ষে প্রকাশ না করার জন্য তাকে অনুরোধ করা হয়েছিল।
মমতা বলেন, বাংলাদেশের একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের পর আমাদের এসটিএফ আটক করেছিল। তারা মেঘালয় সীমান্ত হয়ে এ রাজ্যে এসেছিল। এই সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব রাজ্য পুলিশের। কিন্তু পরে অমিত শাহ আমাকে ফোন করে বলেন, বিষয়টি যেন প্রকাশ্যে না আসে, কারণ এটি দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট।
এ সময় অমিত শাহকে উদ্দেশ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কার নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল? কার কার নাম উঠে এসেছিল? সরকার বদলে গেলেও আমি সব জানি। আমার কাছে অনেক তথ্য রয়েছে।
মমতার দাবি, দীর্ঘদিন তিনি এ বিষয়ে নীরব ছিলেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে মুখ খুলতে হয়েছে। তিনি বলেন, আমি সেই নাম প্রকাশ করতে চাই না। কারণ তা বললে বাংলাদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হবে। আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি, তাই দেশের স্বার্থে সেই নাম প্রকাশ করছি না।
এদিন তিনি মিশনারিজ অব চ্যারিটির তহবিল বন্ধের বিষয়েও কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করেন।
বিধানসভা নির্বাচনের পর বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে ঘিরে তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে প্রায় ৬০ জনকে বিদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। মঙ্গলবারের ধর্না কর্মসূচিতেও উপস্থিত ছিলেন মাত্র ছয়জন বিধায়ক।
এ পরিস্থিতিতে বিজেপিকে দায়ী করে মমতা অভিযোগ করেন, দিল্লি থেকে পরিকল্পিতভাবে তৃণমূলকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। তার ভাষায়, পুলিশকে ব্যবহার করে আমাদের বিধায়ক ও কাউন্সিলরদের ভয় দেখানো হচ্ছে। তবে এসব চেষ্টা সফল হবে না।
কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, অনেকবার আমাকে নানা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দলের নিজস্ব আদর্শ ও নীতি রয়েছে। আজ সবচেয়ে কষ্ট হয়, যাদের জন্য সারাজীবন কাজ করেছি, তাদের কেউ কেউ বিশ্বাসঘাতকদের পাশে দাঁড়িয়েছে। যারা দল ভাঙার চেষ্টা করছে, তাদের জন্য আমি শুভবুদ্ধি কামনা করি।
ধর্না কর্মসূচি শুরুর আগে তিনি রেড রোডে গিয়ে ভারতীয় সংবিধানের প্রধান রূপকার বি আর আম্বেদকর এবং মহাত্মা গান্ধীর মূর্তিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর ওয়াই চ্যানেলে এসে কর্মসূচিতে যোগ দেন। যদিও তৃণমূলের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে ব্যাপক উপস্থিতির আহ্বান জানানো হয়েছিল, তবু উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাংসদ ও বিধায়কের উপস্থিতি দেখা যায়নি।
সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ৮০টি আসনে জয় লাভ করেছিল। তবে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে সোমবারই দুই বিধায়ককে বহিষ্কার করা হয়। ফলে বর্তমানে ৭৮ জন বিধায়কের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক জনপ্রতিনিধি ও নেতাকর্মীকে এদিনের কর্মসূচিতে দেখা যায়। উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন কুনাল ঘোষ, শোভন দেব চট্টোপাধ্যায়, মদন মিত্র, অশোক দেব, নয়না ব্যানার্জি, সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জি ও দোলা সেন। দলনেত্রীর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কর্মসূচিতে দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এ সুযোগে কটাক্ষ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও রাজ্যের মন্ত্রী তাপস রায়। শুভেন্দু বলেন, অবস্থা এতটা খারাপ হবে ভাবিনি। দেড়শ মানুষও আসেনি। সাংবাদিকরা না থাকলে দৃশ্যটা আরও বিব্রতকর হতো।
অন্যদিকে তাপস রায় মন্তব্য করেন, এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। ক্ষমতায় থাকলে অহংকার দেখানো উচিত নয়। সেই অহংকারই একসময় সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও গভীর হচ্ছে। মঙ্গলবার কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর পদ থেকে তারক সিংয়ের পদত্যাগ সেই জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে।
এদিকে তাপস রায়ের একটি ফেসবুক পোস্ট নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। সেখানে তিনি লেখেন, তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। মহারাষ্ট্রের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রায় ৫০ জন তৃণমূল বিধায়ককে নিয়ে ঋতব্রত ব্যানার্জি বিধানসভার স্পিকারের কাছে পৌঁছে গেছেন। খেলা হবে।
পরে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তাপস রায় বলেন, তৃণমূল এখন কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। এক অংশ মমতাকে মানতে চাইছে না, অন্য অংশ অভিষেককে অস্বীকার করছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অবশ্যম্ভাবী ছিল। কারণ দলটি ধীরে ধীরে অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গায়ক, গায়িকা, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে গড়ে উঠেছিল। বাংলার আঞ্চলিক দল হয়েও সর্বভারতীয় ভাবমূর্তি গড়তে বিভিন্ন রাজ্য থেকে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের এনে রাজ্যসভা ও লোকসভায় পাঠানো হয়েছিল।







