গত ১ মে লন্ডনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ওঠে ৩২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। তখনই বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে পরিস্থিতি যে আরও ভয়াবহ দিকে যাবে, তা কেউ ভাবেননি। ২৭ মে লন্ডনের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর ‘মেট অফিস’ জানিয়েছে, কিউ গার্ডেনে রেকর্ড হওয়া এই তাপমাত্রা ২০১৯ সালের ৩৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আগের রেকর্ড ভেঙে নতুন নজির গড়েছে।
শুধু ইংল্যান্ড নয়, ওয়েলসেও দেখা দিয়েছে অস্বাভাবিক গরম। দেশটির ফ্লিন্টশায়ারের হাওয়ার্ডেন বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৩২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস
একই সঙ্গে দক্ষিণ ইউরোপের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়েও চলছে তীব্র তাপপ্রবাহ। গরম ও ঘামে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সেখানকার বাসিন্দারা।
মেট অফিস বলছে, যুক্তরাজ্যে গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়েও যে তাপমাত্রাকে ‘অস্বাভাবিক’ ধরা হতো, মে মাসেই তা ছাড়িয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি এখন ‘ব্যতিক্রমী’। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইংল্যান্ডের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসও অতিক্রম করতে পারে।
দিনের পাশাপাশি রাতের গরমও বাড়িয়েছে দুর্ভোগ। ২৪ মে লন্ডনে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা মে মাসের উষ্ণতম রাতের রেকর্ড। মেট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার ১২টি রেকর্ডের মধ্যে সাতটিই হয়েছে ২০০৩ সালের পর।
লন্ডন মেট অফিসের প্রধান অপারেশনাল আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ড্যান সুরি বলেন, যুক্তরাজ্যের কাছাকাছি একটি উচ্চচাপ বলয় তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবেই অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা দেখা দিচ্ছে। সাধারণত মে মাসের শেষদিকে দেশটিতে গড় তাপমাত্রা থাকে ১৪ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। কিন্তু বর্তমানে তা গড়ের চেয়ে ১২ থেকে ১৮ ডিগ্রি বেশি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় গত ২২ মে যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থা ইউকে হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সি ২০২৬ সালের প্রথম ‘অ্যাম্বার হিট-হেলথ অ্যালার্ট’ জারি করে। এই সতর্কতা জারি হয়েছে ইংল্যান্ডের ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস, ইস্ট মিডল্যান্ডস, ইস্ট অব ইংল্যান্ড, সাউথ ইস্ট ও লন্ডনে। এছাড়া নর্থ ইস্ট, নর্থ ওয়েস্ট, সাউথ ওয়েস্ট, ইয়র্কশায়ার ও হাম্বার অঞ্চলে জারি রয়েছে ইয়েলো অ্যালার্ট।
স্কটল্যান্ড ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডেও এ বছর এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। ২৫ মে স্কটল্যান্ডের চার্টারহলে তাপমাত্রা ছিল ২৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং কাউন্টি ফারমানার ডেরিলিনে ছিল ২৫ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সাধারণত শীতল আবহাওয়ার জন্য পরিচিত স্কটিশ হাইল্যান্ডসে এমন তাপমাত্রা স্থানীয়দের জন্য বিরল অভিজ্ঞতা।
তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে পানির চাহিদাও। অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। সাসেক্স ও কেন্ট এলাকায় প্রায় ৫০০ বাড়িতে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে সাউথ ইস্ট ওয়াটার জানিয়েছে, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই এ ধরনের অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ বাড়ছে। মেট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬১ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার দিনের সংখ্যা যত ছিল, গত ১০ বছরে তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। একইভাবে ৩০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রার দিনের সংখ্যা বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি।
শুধু যুক্তরাজ্য নয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও ভাঙছে তাপমাত্রার রেকর্ড। স্পেনে রোববার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা পৌঁছায় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ফ্রান্স ও জার্মানির বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রির ঘরে পৌঁছেছে। ফলে বহু জায়গায় মে মাসের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে গেছে।
তীব্র গরমে ফ্রান্সে ইতোমধ্যে দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, প্যারিস থেকে নিসগামী একটি ট্রেনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণবিহীন বগিতে কয়েকশ যাত্রী প্রায় চার ঘণ্টা আটকা পড়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন। অতিরিক্ত গরম সহ্য করতে না পেরে অনেক যাত্রী রেললাইনে নেমে যান।
ফ্রান্স, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, স্পেন ও উত্তর ইতালির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মে মাসের শেষ সপ্তাহে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি রয়েছে। আবহাওয়াবিদরা আশঙ্কা করছেন, চলমান তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে ইউরোপের আরও অনেক এলাকায় নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড তৈরি হতে পারে।







