একদিন আফ্রিকা মহাদেশ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে— আর সেই ফাঁকা জায়গা দখল করবে একটি নতুন মহাসাগর। সাম্প্রতিক গবেষণার ভিত্তিতে এমন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ন্যাচার কমিনিউকেশনসে। এতে বলা হয়েছে, পূর্ব আফ্রিকার বিস্তীর্ণ ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল ‘টারকানা রিফট’ ধীরে ধীরে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা সিসমিক (ভূকম্পন) ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, টারকানা অঞ্চলের ভূত্বক আগের ধারণার তুলনায় অনেক দ্রুত ভেঙে পড়ার দিকে এগোচ্ছে।
এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় কন্টিনেন্টাল রিফটিং— যেখানে পৃথিবীর শক্ত বাইরের স্তর (ভূত্বক) ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়ে ফাটল তৈরি করে এবং একসময় ভেঙে যায়।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স বিভাগের গবেষক ক্রিশ্চিয়ান রোয়ান বলেন, মহাদেশীয় ফাটল এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে ভূত্বক ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে।
তার মতে, টারকানা রিফট বর্তমানে ‘নেকিং’ নামে পরিচিত এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। এই অবস্থায় ভূত্বক এতটাই পাতলা হয়ে যায় যে ভবিষ্যতে সেখানে নতুন সমুদ্রের তলদেশ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মোজাম্বিক থেকে ইথিওপিয়ার আফার অঞ্চল পর্যন্ত পুরো পূর্ব আফ্রিকাজুড়ে এই পরিবর্তন চলছে। বিশেষ করে আফার অঞ্চলে ইতোমধ্যেই এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যা নতুন সমুদ্র গঠনের প্রাথমিক ধাপ নির্দেশ করে।
রোয়ান বলেন, উত্তরের লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর সংলগ্ন আফার অঞ্চলে মহাসাগরীয় ভূত্বকের প্রাথমিক রূপ ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে।
এ ধরনের ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন নয়। একসময় সব মহাদেশ একত্রে ছিল— যাকে বলা হয় প্যানজিয়া। কোটি বছর আগে তা ভেঙে গিয়ে সৃষ্টি হয় বর্তমানের মহাসাগরগুলো, যার মধ্যে অন্যতম আটলান্টিক মহাসাগর।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রায় ৪৫ মিলিয়ন বছর আগে টারকানা অঞ্চলের ভাঙন শুরু হয়। পরে আগ্নেয়গিরির তৎপরতার কারণে প্রায় ৪ মিলিয়ন বছর আগে এর সরু অংশ তৈরি হয়।
তবে এই পরিবর্তন হঠাৎ ঘটবে না। গবেষকদের মতে, পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আরও কয়েক মিলিয়ন বছর সময় লাগবে। কিন্তু একবার তা সম্পূর্ণ হলে আফ্রিকার মানচিত্র আমূল বদলে যাবে এবং সৃষ্টি হবে একটি নতুন মহাসাগর।
এই রিফট অঞ্চল শুধু ভূতাত্ত্বিক দিক থেকেই নয়, মানব ইতিহাসের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। টারকানা এলাকায় এখন পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, যা মানবজাতির উৎপত্তি নিয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই অনেক বিজ্ঞানী একে মানবজাতির ‘আঁতুরঘর’ হিসেবেও বিবেচনা করেন।