সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক মো. জামালের (৫০) মরদেহ নিয়ে দীর্ঘ টানাপোড়েন ও পরিবারের লড়াইয়ের অবসান ঘটেছে। দালাল চক্রের অনৈতিক অর্থ দাবি এবং প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর গত রাতে জামালের মরদেহ তার নিজ গ্রাম কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার ব্রাহ্মণকান্দিতে এসে পৌঁছেছে।
নিহত মো. জামাল কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের ব্রাহ্মণকান্দি গ্রামের আব্দুল খালেকের ছেলে। নিহত জামালের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। প্রিয়জনকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসী। তাদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে রাত ১টার দিকে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। জামালের মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পারিবারিক সুত্রে জানা যায়, নিহত জামাল উদ্দিন দীর্ঘ দিন ধরে সৌদি আরবের রিয়াদে পানি সরবরাহের (পানির লাইন) কাজ করতেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইফতারের ঠিক আগে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে জিজান শহরের আস-সাইর নামক স্থানে একটি দ্রুতগামী সৌদি যান তাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে আল শানান জেনারেল হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সহকর্মীদের মতে, দুর্ঘটনায় জামালের কোনো দোষ ছিল না এবং পুলিশ ঘাতক গাড়িটিকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করে। কিন্তু জামালের মৃত্যুর পরই শুরু হয় আরেক অমানবিক অধ্যায়। সেখানে অবস্থানরত প্রতিবেশী দালাল বোরহান ও সহকর্মী আজিজ মরদেহ দেশে পাঠাতে অসহযোগিতা শুরু করে।
অভিযোগ উঠেছে, মরদেহ দেশে পাঠাতে তারা অসহযোগিতা শুরু করে এবং জামালের পরিবারকে বিভ্রান্ত করতে থাকে। দালাল বোরহান দাবি করে যে, দুর্ঘটনায় নিহতেরই ২৫% দোষ ছিল। মরদেহ দেশে পাঠানোর বিনিময়ে পরিবারের কাছে সাড়ে ৪ লাখ টাকা দাবি করে বোরহান। টাকা না দিলে মরদেহ ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে দাফন করার হুমকিও দেন তিনি। দালালদের হুমকিতে দমে না গিয়ে গত ১২ মার্চ নিহতের পরিবার সরাসরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানায়। মাঝপথে প্রশাসনিক ও ঠিকানা সংক্রান্ত কিছু বিভ্রান্তি দেখা দিলেও পরিবারের অনড় অবস্থান এবং মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে দালালদের দাবি করা কোনো টাকা ছাড়াই সরকারি উদ্যোগে মরদেহটি দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।
প্রতিবেশী মো. রুবেল জানান, শুরুতে কিশোরগঞ্জ প্রবাসী কল্যাণ শাখা অফিসে আবেদন করলেও সেখানে সঠিক দিক-নির্দেশনার অভাব ও প্রশাসনিক গাফিলতি ছিল। পরবর্তীতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের দলের নেতা আবু হানিফ ভাইয়ের বিশেষ তদারকিতে মরদেহ ফেরানোর প্রক্রিয়াটি গতি পায়। নিহত জামাল ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার ১৬ বছর বয়সী একমাত্র মেয়ে মারিয়া বর্তমানে কিশোরগঞ্জ পৌর মহিলা কলেজে পড়াশোনা করছে। বাবার মৃত্যুতে তার উচ্চশিক্ষা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অত্যন্ত দরিদ্র এই পরিবারটির স্বচ্ছলতা ফেরাতে এবং পিতৃহারা মেয়েটির পড়াশোনা চালিয়ে নিতে সরকারি আর্থিক অনুদানের জোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় এলাকার বাসিন্দা বলেন, জামালের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী এবং গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদের সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ যে নিরলস সহযোগিতা করেছেন, তার জন্য আমরা তাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। মূলত তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলেই এই মরদেহটি অত্যন্ত দ্রুত এবং সহজে আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে। বিশেষ করে মন্ত্রীর একান্ত সহকারী আবু হানিফ ভাই যেভাবে বিষয়টি তদারকি করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এই মহতী উদ্যোগের জন্য আমরা এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে মাননীয় মন্ত্রী এবং আবু হানিফ সাহেবকে অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
নিহতের মেয়ে মারিয়া আক্তার বলেন, বাবা বলেছিল ঈদের ছুটিতে বাড়িতে আসবেন। আমার জন্য তিনি অনেক কিছু কেনাকাটা করেছিলেন, কিন্তু বাবার মরদেহের সাথে তার সেই স্মৃতিগুলোর কিছুই আসেনি। বাবা আমাকে একটি জামা পাঠিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন সেটি পরে যেন আমি হাতে একগুচ্ছ ফুল নিয়ে তাকে আনতে যাই। কিন্তু আমার আর যাওয়া হলো না। বাবা ফিরলেন ঠিকই, তবে জীবিত নয়—কফিনবন্দি হয়ে। আমার কোনো ভাই-বোন নেই, আমি একেবারেই একা হয়ে গেলাম।
মরদেহ বুঝে পাওয়ার পর নিহতের স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার মাথা গোঁজার ঠাঁই নাই, এত টাকা কোথায় পাব? কিন্তু আমার মেয়ে চেয়েছিল তার বাবার কবরটা যেন নিজ দেশে থাকে। এক ফোঁটা রক্ত থাকতে আমি আমার স্বামীর লাশ সৌদিতে বেওয়ারিশ হতে দিইনি। অনেক লড়াই করে আজ মেয়ের কাছে তার বাবাকে ফিরিয়ে এনেছি।
গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ বলেন, বর্তমান সরকার প্রবাসীদের সমস্যাগুলো আন্তরিকতার সাথে দেখছে। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের সৌদি প্রবাসী জামালের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পেরে আমি প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরকে বিস্তারিত অবগত করি। বিষয়টি জানার পর তিনি দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও সরাসরি হস্তক্ষেপে গতকাল কোনো প্রকার খরচ ছাড়াই প্রবাসী জামালের মরদেহটি তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।