শরীরের শক্তির প্রধান উৎস হলো গ্লুকোজ বা রক্তে থাকা শর্করা। কোনো কারণে রক্তে এই শর্করার মাত্রা কমে গেলে শরীর ও মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে এটি এমনকি চেতনার বিলুপ্তি বা কোমায় যাওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। তাই ব্লাড সুগার কমে যাওয়ার কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জানা প্রত্যেকের জন্য জরুরি।
রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যাওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘হাইপোগ্লাইসেমিয়া’ বলা হয়। এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য যেমন চিন্তার বিষয়, তেমনি সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রেও হঠাৎ বিপদ ডেকে আনতে পারে।
ব্লাড সুগার বা শর্করা কমে যাওয়ার লক্ষণ
রক্তে শর্করা কমে গেলে সাধারণত নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়:
আকস্মিক শরীর কাঁপা এবং ঘাম হওয়া।
তীব্র ক্ষুধা অনুভব করা।
বুক ধড়ফড় করা এবং অস্থিরতা।
মাথা ঘোরা বা হালকা বোধ করা।
চোখে ঝাপসা দেখা।
খিটখিটে মেজাজ বা মনোযোগের অভাব।
হঠাৎ সুগার কমে যাওয়ার প্রধান কারণ
১. খাবারে অনিয়ম: দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা বা খাবারের সময় পার করে দেওয়া সুগার কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
২. অতিরিক্ত পরিশ্রম: সামর্থ্যের চেয়ে বেশি শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করলে রক্তে থাকা গ্লুকোজ দ্রুত খরচ হয়ে যায়।
৩. ওষুধের ভুল মাত্রা: ডায়াবেটিস রোগীরা যদি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ইনসুলিন বা ওষুধ গ্রহণ করেন, তবে সুগার হঠাৎ নেমে যেতে পারে।
৪. অ্যালকোহল সেবন: খালি পেটে মদ্যপান লিভারের গ্লুকোজ তৈরির প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
৫. অসুস্থতা: যকৃৎ বা কিডনির গুরুতর রোগ এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতাও এর জন্য দায়ী হতে পারে।
তাৎক্ষণিক প্রতিকার: ‘১৫-১৫’ নিয়ম
ব্লাড সুগার কমে গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। চিকিৎসকরা এক্ষেত্রে ‘১৫-১৫ নিয়ম’ অনুসরণ করতে বলেন:
১৫ গ্রাম দ্রুত শর্করা গ্রহণ: সুগার কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দিলেই ১৫ গ্রাম শর্করা যুক্ত খাবার খান। যেমন— ৩-৪ চা চামচ চিনি মেশানো পানি, আধা কাপ ফলের রস, অথবা ৪-৫টি গ্লুকোজ বিস্কুট।
১৫ মিনিট অপেক্ষা: খাবার খাওয়ার পর ১৫ মিনিট বিশ্রাম নিন এবং সম্ভব হলে সুগার চেক করুন।
পুনরাবৃত্তি: যদি ১৫ মিনিট পর সুগার না বাড়ে, তবে আবার ১৫ গ্রাম শর্করা গ্রহণ করুন।
দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধে করণীয়
নিয়মিত খাবার গ্রহণ: প্রতি বেলা খাবার নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়ার অভ্যাস করুন। একবারে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া ভালো।
সতর্ক ব্যায়াম: ব্যায়াম বা কঠোর পরিশ্রমের আগে এবং পরে হালকা কিছু খেয়ে নিন।
ওষুধে সচেতনতা: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধের মাত্রা ঠিক রাখুন। নিজের ইচ্ছামতো ইনসুলিন বা ট্যাবলেটের ডোজ পরিবর্তন করবেন না।
জরুরি কিট: যারা নিয়মিত হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় ভোগেন, তারা সবসময় পকেটে বা ব্যাগে চকলেট অথবা গ্লুকোজ ক্যান্ডি রাখুন।
বি. দ্র.: যদি আক্রান্ত ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে যান, তবে তাকে মুখে কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন না। এতে শ্বাসরোধ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
ব্লাড সুগার নিয়মিত ওঠানামা করলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সুস্থ থাকতে নিয়মমাফিক জীবনযাপনের কোনো বিকল্প নেই।