মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১০ পূর্বাহ্ন

রাজধানীর অলিগলিতে পথশিশুদের ভয়ংকর নেশা ‘ড্যান্ডি’ ধ্বংস হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

মাসুদ মাহাতাব,মুগদা প্রতিনিধি
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬

রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক, ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল কিংবা বস্তির অন্ধকার কোণে নীরবে ছড়িয়ে পড়ছে ভয়াবহ এক মাদক— ‘ড্যান্ডি’ গাম। স্বল্পমূল্যের এই আঠাজাতীয় দ্রব্য এখন পথশিশুদের নেশার সহজ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে ঢাকার গুলিস্তান, কমলাপুর, খিলগাঁও, মালিবাগ, তেজগাঁও, রামপুরা ও বিভিন্ন বস্তি এলাকায় প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে শিশু-কিশোরদের পলিথিনে ড্যান্ডি নিয়ে নেশা করতে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক পথশিশু দিনের বেলায় ভাঙারি কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করলেও রাত নামলেই তারা জড়ো হয় নেশার আসরে। কেউ একা, কেউ দলবেঁধে পলিথিন, কাপড় কিংবা জামায় ড্যান্ডি লাগিয়ে বারবার ঘ্রাণ নেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা এক ধরনের অচেতন ঘোরের মধ্যে চলে যায়। নেশার সহজলভ্যতা, শিশুদের ভয়াবহ আসক্তি ড্যান্ডি বা ডেনড্রাইট মূলত জুতা, চামড়া, প্লাস্টিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি জোড়া লাগানোর কাজে ব্যবহৃত আঠা। এতে থাকা টলুইন নামের রাসায়নিক উপাদান বাষ্প হয়ে শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে এবং সাময়িক উন্মাদনা তৈরি করে। পথশিশুরা এই নেশায় দ্রুত আসক্ত হয়ে পড়ে কারণ এটি সহজলভ্য ও সস্তা। যে কোনো হার্ডওয়্যার দোকানেই অল্প টাকায় পাওয়া যায় এই আঠা। ফলে মাদক ব্যবসায়ীরা সহজেই শিশুদের হাতে এটি তুলে দিচ্ছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য পথশিশু নিয়মিত ড্যান্ডি, পলিথিনে গাম, এমনকি পেট্রোল শুঁকে নেশা করছে। ফুটপাতের পাশে দাঁড়িয়ে বা দেয়ালে হেলান দিয়ে থাকা এসব শিশুদের হাতে দেখা যায় পলিথিনের ব্যাগ। কয়েক মিনিট গন্ধ নেওয়ার পর তারা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। স্বাস্থ্যঝুঁকি ভয়াবহ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ড্যান্ডির নেশা শিশুর মস্তিষ্ক, শ্বাসতন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। টলুইনসমৃদ্ধ এই আঠা শরীরে প্রবেশের পর প্রথমে মাথা ঘোরা, ক্ষুধামন্দা, ঝিমুনি ও মানসিক নিয়ন্ত্রণহীনতা সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয় এবং শারীরিক বিকাশ ব্যাহত হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। কারণ, তাদের শরীর ও মস্তিষ্ক এখনো বিকাশমান। ফলে অল্প বয়সেই তারা মানসিক ও শারীরিকভাবে স্থায়ী ক্ষতির মুখে পড়ে। কারা জড়িত এই ভয়ংকর চক্রে অনুসন্ধানে জানা গেছে, পথশিশুদের মধ্যে ড্যান্ডি ছড়িয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে একটি সক্রিয় চক্র। ভাঙারি ক্রেতা, স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী ও কিছু অসাধু দোকানি শিশুদের কাছে এই নেশাদ্রব্য পৌঁছে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের ভাঙারি বিক্রির টাকার বড় অংশ চলে যায় এই নেশার পেছনে। সমাজকর্মীরা জানান, বেশিরভাগ পথশিশুই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, নির্যাতনের শিকার বা চরম দারিদ্র্যের কারণে রাস্তায় এসেছে। এই অসহায় অবস্থাকে পুঁজি করেই মাদকচক্র তাদের আসক্ত করে তুলছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অশনিসংকেত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশে কয়েক লাখ পথশিশু রয়েছে, যার বড় একটি অংশ রাজধানী ঢাকায়। শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, এদের বড় অংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদকের সংস্পর্শে রয়েছে। একসময় কেবল টোকাই শ্রেণির শিশুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন ড্যান্ডি নেশা ছড়িয়ে পড়ছে নিম্নবিত্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের মধ্যেও। এতে করে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে একটি সম্ভাবনাময় প্রজন্ম। সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া রক্ষা নেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিবার, সমাজ, প্রশাসন ও শিশু অধিকার সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ড্যান্ডির অবাধ বিক্রি নিয়ন্ত্রণ, পথশিশুদের পুনর্বাসন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। কারণ আজকের পথশিশুই আগামী দিনের নাগরিক। তাদের হাতে যদি বইয়ের বদলে পৌঁছে যায় মাদক, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো জাতি। নীরবে বেড়ে ওঠা এই ভয়ংকর নেশা রোধে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে ভয়াবহ। তাই পথশিশুদের মাদকমুক্ত রাখতে জরুরি সচেতনতা, কঠোর নজরদারি ও মানবিক উদ্যোগ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102