শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩৪ অপরাহ্ন

গতি ও তাপকে কীভাবে মোকাবিলা করেছে আর্টিমিস-২, বিজ্ঞান কি বলে

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬

চাঁদের কক্ষপথ থেকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় একটি মহাকাশযানকে যে অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়, তা কল্পনা করাও কঠিন। আর্টেমিস-২ মিশনের ‘ওরিয়ন’ ক্যাপসুলটি যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আঘাত করে, তখন এর গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার-যা শব্দের গতির চেয়ে ৩২ গুণ বেশি। এই প্রচণ্ড ঘর্ষণে তৈরি হয় ৩ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, যা সূর্যের উপরিভাগের তাপমাত্রার প্রায় অর্ধেক।

এত প্রতিকূলতা পেরিয়ে নভোচারীদের জীবন রক্ষা করতে মহাকাশ সংস্থা নাসা (NASA) ব্যবহার করেছে অত্যাধুনিক কিছু বৈজ্ঞানিক কৌশল।

১. থার্মাল প্রোটেকশন সিস্টেম (TPS) : অবলেটিভ হিট শিল্ড
ওরিয়ন ক্যাপসুলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর নিচের দিকে থাকা ৫ মিটার ব্যাসের হিট শিল্ড বা তাপ নিরোধক ঢাল। এটি তৈরি করা হয়েছে ‘অ্যাভকোট’ (Avcoat) নামক বিশেষ এক ধরনের উপাদানে।

বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা : এই ঢালটি ‘অ্যাবলেশন’ (Ablation) প্রক্রিয়ায় কাজ করে। যখন প্রচণ্ড তাপে ঢালটি জ্বলতে শুরু করে, তখন এর ওপরের স্তরটি পুড়ে ছাই হয়ে উড়ে যায় এবং সেই সাথে তাপকেও দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। ফলে ক্যাপসুলের ভেতরে নভোচারীরা স্বাভাবিক কক্ষ তাপমাত্রায় (প্রায় ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) নিরাপদে থাকতে পারেন।

২. স্কিপ এন্ট্রি (Skip Entry) কৌশল : জলজ পাথরের মতো লাফানো
পানির ওপর পাথর ছুড়লে যেমন সেটি লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে যায়, ওরিয়ন ক্যাপসুলটিও ঠিক সেইভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছে। একে বলা হয় ‘স্কিপ এন্ট্রি’।

সুবিধা : একবারে বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়লে প্রচণ্ড চাপে ক্যাপসুলটি ধ্বংস হয়ে যেতে পারত। তাই এটি প্রথমে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে কিছুটা গতি কমায়, আবার কিছুটা উপরে উঠে যায় এবং দ্বিতীয়বার চূড়ান্তভাবে প্রবেশ করে। এটি নভোচারীদের ওপর তীব্র ‘জি-ফোর্স’ বা অভিকর্ষজ চাপের প্রভাব কমিয়ে দেয়।

৩. শক ওয়েভ এবং প্লাজমা স্তর
অতিরিক্ত গতির কারণে ক্যাপসুলের সামনের বাতাস প্রচণ্ড সংকুচিত হয়ে একটি ‘শক ওয়েভ’ তৈরি করে। এই বায়ুস্তরটি প্লাজমা (পদার্থের চতুর্থ অবস্থা) তৈরি করে যা প্রচণ্ড উজ্জ্বল দেখায়। ওরিয়ন ক্যাপসুলের বিশেষ আকৃতি এই প্লাজমা প্রবাহকে ক্যাপসুলের গা থেকে কিছুটা দূরে ঠেলে দেয়, যার ফলে সরাসরি তাপের প্রভাব অনেকাংশে কমে যায়।

৪. প্যারাশুট সিস্টেম : গতি নিয়ন্ত্রণ
বায়ুমণ্ডলের বাধা অতিক্রম করার পর যখন ক্যাপসুলটির গতি কমে ঘণ্টায় প্রায় ৫০০ কিলোমিটারে নেমে আসে, তখন শুরু হয় প্যারাশুটের কাজ। ওরিয়নে মোট ১১টি প্যারাশুট ব্যবহার করা হয়। প্রথমে ছোট ড্রগ প্যারাশুট এবং শেষে তিনটি বিশাল প্রধান প্যারাশুট উন্মুক্ত হয়, যা ক্যাপসুলটির গতি কমিয়ে ঘণ্টায় মাত্র ৩০ কিলোমিটারের নিচে নামিয়ে আনে। ফলে সাগরে অবতরণের সময় বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে না।

ভবিষ্যৎ অভিযানের নতুন দিগন্ত
আর্টেমিস-২ মিশনের এই সফল অবতরণ প্রমাণ করেছে যে, আমাদের প্রযুক্তি এখন মঙ্গল গ্রহের মতো দূরবর্তী অভিযান থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনার সক্ষমতা রাখে। এই সুরক্ষা কবচটি কেবল একটি প্রকৌশলগত সাফল্য নয়, বরং এটি মানব ইতিহাসের পরবর্তী বড় উল্লম্ফনের ভিত্তি।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102