সাবেকুন্নাহার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমি শুধু আমার ছেলেদের জন্য না, সারা বাংলাদেশে যেসব মায়ের সন্তানেরা মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাস জীবনে আছে সকল সন্তানের জন্য হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করছি।
মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে সম্ভাব্য আঞ্চলিক যুদ্ধ বা সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থির হওয়ায় এসব দেশ কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বড় ধরনের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে, বাণিজ্য এবং প্রবাসী শ্রমবাজারে প্রভাব পড়তে পারে। তবে এখন পর্যন্ত দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এদিকে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় চরম আতঙ্কে আছেন কাতার প্রবাসী রফিকুল ইসলাম। মুঠোফোনে তিনি রূপালি বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রথম যেদিন কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা হয়, সেদিন থেকেই আমরা চরম আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। প্রথম দিন কাজে যাইনি। বাসায় থাকতেও ভয় লাগছে, কখন আবার বাসার ওপর হামলা হয়। যদিও এখন পর্যন্ত কাতারে মার্কিন ঘাঁটির বাইরে হামলা হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে কিছুই বলা যায় না, কখন কী হয়। দুই দিন ধরে কাজে যাচ্ছি। তবে সারা দিনই আতঙ্কের মধ্যে থাকি। রাতে ভয়ে ঘুম আসে না।
শুধু রফিকুল ইসলাম একা নন, বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের। দেশের প্রবাসী–অধ্যুষিত জেলা নরসিংদী। এই জেলার প্রবাসীদের প্রায় ৬৬ শতাংশই থাকেন মধ্যপ্রাচ্যে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ইরান-ইসরায়েল ছাড়াও লেবানন, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, ওমান, ইরাক ও সাইপ্রাসে হামলা হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে।
মুঠোফোনে কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কুয়েতে অবস্থানরত ৭ জন প্রবাসীর সঙ্গে কথা হয়েছে রূপালি বাংলাদেশের। আতঙ্ক ও উদ্বেগ নিয়ে তাদের দিন কাটছে। এরই মধ্যে অনেকের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সেটি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন তারা। এই পরিস্থিতিতে দেশে থাকা প্রবাসী পরিবারের সদস্যরাও দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
বেলাবো উপজেলার বিনা বাইক গ্রামের বাসিন্দা সিয়াম মিয়া সৌদি আরবের রিয়াদে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। নির্মাণ, পরিবহন, পর্যটন ও আবাসন ব্যবসা রয়েছে তার। তার এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ১১২ জন বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন।
সিয়াম মিয়া মুঠোফোনে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে আতঙ্কের পাশাপাশি চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের। সরকারিভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে আপাতত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না থাকার জন্য। আমাদের বেশির ভাগ ব্যবসাই বাইরে। শুধু অফিসের ২০-২২ জন স্টাফ কাজ করতে পারছেন। বাকিদের মধ্যে পরিবহনে যারা আছেন, তারা কিছু লোক কাজে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘এই মাসে আমার দেশে যাওয়ার জন্য টিকিট কাটা আছে। এমন পরিস্থিতিতে কী হবে, বুঝতে পারছি না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে পরিস্থিতি কখন স্বাভাবিক হবে, সেটিও আমরা জানি না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে প্রবাসীরা চরম সংকটে পড়তে পারেন। মার্কিন ঘাঁটিতে ইরান হামলা করলেও সেটির ধ্বংসাবশেষ বাইরে পড়ছে। এতে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বেশি ছড়াচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ কাতারের টাউন এলাকায় থাকেন শিবপুর উপজেলা জয়নগর ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের সাত্তার গাজী । সেখানে গাড়ির যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন সরঞ্জামের দোকান রয়েছে তার।
মুঠোফোনে তিনি রূপালি বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু রেখেছি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির কারণে আগের মতো ক্রেতা নেই। বিশেষ করে আরবিয়ানরা (দেশটির নাগরিক) খুব বেশি প্রয়োজন না হলে বাসা থেকে বের হচ্ছেন না। বাংলাদেশি যারা আছেন, তারা পেটের দায়ে অনেকটা বাধ্য হয়ে কাজে বের হচ্ছেন। আবার অনেকে কাজও পাচ্ছেন না। এরই মধ্যে বাহারানে এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। প্রবাসীরা চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। অবস্থাটা এমন হয়েছে, বাসায় থাকলেও ভয় লাগে, আবার বাইরে যেতেও ভয় লাগে।’
নরসিংদী রায়পুরা মেতিকান্দা এলাকার হযরত আলী থাকেন কুয়েতে। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা চরম ঝুঁকিতে পড়বেন। এখানে মানুষ কাজেই বের হতে ভয় পাচ্ছেন। দিনে দিনেই পরিস্থিতি আতঙ্কজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। সামনে এভাবে চলতে থাকলে প্রবাসীদের আয়ও বন্ধ হয়ে যেতে পারে বা কমে যেতে পারে। এতে চরম সমস্যায় পড়বেন দেশে থাকা প্রবাসীদের পরিবারও।
একই পরিবারের তিন ভাই সৌদি আরবে থাকেন। বড় ভাই আমজাদ বলেন, তাদের তিনজনের স্ত্রী-সন্তানেরাও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। সামনে ঈদুল ফিতর এমন পরিস্থিতিতে প্রবাসীরা ঠিকমতো কাজও করতে পারছেন না। আমরা চাই, এই যুদ্ধ বন্ধ হোক।
জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস, নরসিংদী সহকারী পরিচালক মালিক মোহাম্মদ তৈমুর গোফরান বলেন, প্রবাসীদের বিষয়ে সেন্টারলি আমাদের অফিসিয়াল হটলাইন চালু আছে। অর্থাৎ আমাদের মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি কমিটি করেছেন। সেই কমিটি কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের দূতাবাসগুলো সর্বক্ষণিক কাজ করছে। যাদের বিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে তাদের ব্যাপারে দেশগুলো অনেকটাই শিথিল। মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইট বাতিলে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া, নতুন ফ্লাইটের সময়সূচিসহ যে কোন সহায়তার জন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এর সার্বক্ষণিক হটলাইন চালু আছে।
হট লাইন নাম্বার :-
+৮৮০-২-৪৮৩১৮২০৪
+৮৮০১৮১৯২৬০৫৪৫/+৮৮০২-৪১০৩০২২৮/
+৮৮০১৭০৫৪২৩৬৮৮/+৮৮০২-২২২২২৩২৪৭
+৮৮০১৭১৪৭৬৬৭১৬/+৮৮০২-৪৯৩৪৯৯২৫
+৮৮০১৭১১১১১৫৪৪







