রাতের আঁধারেও যেন দিনের আলো। এ রকম এক কৃত্রিম আলোয় চাষ হচ্ছে ড্রাগন। দিন বাড়াতে কৃত্রিম আলো, অমৌসুমে তিন গুণ হচ্ছে ফলন।
যশোরের শার্শায় ‘লাইট ইনডোর্স’ পদ্ধতিতে ড্রাগন চাষে কৃষকের ফিরেছে নতুন দিগন্ত। লাভবান হচ্ছে চাষিরা, বাড়ছে চাষ। খুশি তারা। আধুনিক ইনডোর লাইটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে অমৌসুমে ড্রাগন চাষে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা আবেদুর রহমান। শীতের সময়ে কৃত্রিম আলো ব্যবহার করে ড্রাগনের ফলন বাড়িয়েছেন প্রায় তিন গুণ। তার এই উদ্ভাবনী উদ্যোগ শার্শার কৃষি খাতে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। শার্শা উপজেলার বেনাপোলের আবেদুর রহমান এই নতুন প্রযুক্তির সফল প্রয়োগকারী হিসেবে ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কৃষিপ্রধান যশোরের শার্শা উপজেলায় ভালো ফলন পেতে রাতের বেলায় গাছে গাছে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালিয়ে চাষ হচ্ছে ড্রাগন ফল। এভাবে চাষাবাদকে বলা হচ্ছে ‘লাইট পদ্ধতি’। উপজেলাজুড়ে বিভিন্ন মাঠে আধুনিক ইনডোর লাইটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে অমৌসুমে ড্রাগন চাষে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা আবেদুর রহমান।
উদ্ভাবনী উদ্যোগ শার্শার কৃষি খাতে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। ১০ বিঘা জমিতে ৭০ লাখ টাকা খরচে বছরে পাওয়া যায় ৪০ লাখ টাকা। ১০ বছর ধরে হারবেস্ট করা যায় ড্রাগনের। তাই তো সফলতা পাচ্ছেন চাষিরা। আগ্রহ বাড়ছে চাষে।
শীতের আমেজেও গাছগুলো ফুল দিতে শুরু করে। আলোকসজ্জায় সজ্জিত এই ড্রাগন বাগান এখন শুধু কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রই নয়, দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হয়েছে। সারিবদ্ধ ড্রাগন গাছ আর মাথার ওপরে এলইডির আলোর ঝলকানি মাঠজুড়ে তৈরি করে এক নান্দনিক দৃশ্য।
অনেক দর্শনার্থীর মতে, এই দৃশ্য ইউরোপের উন্নত শহর কিংবা বিদেশের উন্নত কৃষি খামার। এই দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ভিড় করছেন শত শত দর্শনার্থী। এসব বাগানের ড্রাগন শার্শা উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে যশোরসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। ঢাকার কিছু ব্যবসায়ীরা এখান থেকে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
ড্রাগন চাষি আবেদুর রহমান বলেন, প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে ১০ বিঘা জমিতে ড্রাগন চাষ শুরু করি। এর মধ্যে শীতকালীন অমৌসুমে উৎপাদন নিশ্চিত করতে ১০ বিঘা জমিতে চালু করা হয়েছে লাইটিং বা কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা।
আবেদুরের মতে, সাধারণত ভরা মৌসুমে ড্রাগনের যে দাম পাওয়া যায়, অমৌসুমে ফলন ধরাতে পারলে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি লাভে বিক্রি করা সম্ভব।
সাধারণত শীতকালে দিন ছোট হওয়ায় সূর্যের আলোর অভাবে ড্রাগন গাছে ফুল ও ফল আসা কমে যায়। এই প্রতিকূলতাকে কাটিয়ে তুলতে আবেদুর তার ১০ বিঘার ড্রাগন বাগানে স্থাপন করেছেন বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী শত শত এলইডি বাল্ব। প্রতিদিন সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ড্রাগন বাগানজুড়ে আলো জ্বলে ওঠে, যা একদিকে যেমন গাছের ফুল ধরতে সহায়ক হচ্ছে, তেমনি তৈরি করছে চোখ ধাঁধানো এক নান্দনিক দৃশ্য।
আবেদুর বলেন, বাগানে প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা ও ভোররাত ৩টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত দুই দফায় এই কৃত্রিম আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়। এতে গাছের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া সচল থাকে। শীতের আমেজেও গাছগুলো ফুল দিতে শুরু করে।
এদিকে সন্ধ্যা নামলেই আলোকসজ্জায় সজ্জিত এই ড্রাগন বাগান এখন শুধু কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রই নয়, দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হয়েছে। সারিবদ্ধ ড্রাগন গাছ আর মাথার ওপরে এলইডির আলোর ঝলকানি মাঠজুড়ে তৈরি করে এক নান্দনিক দৃশ্য।
ড্রাগন বাগান দেখতে আসা দর্শনার্থী রাশেদুর রহমান রাশু বলেন, সাধারণত জমিতে ড্রাগন চাষ হয়ে থাকে। আমি কখনো শুনেনি লাইটিং পদ্ধতিতে ড্রাগন চাষ হয়। এটা শোনার পর আমি দেখতে এসেছি। সন্ধ্য থেকে রাত যত বাড়ে আলোর ঝলকানি তত বাড়ে। গোটা এলাকা আলোকিত হয়ে সুন্দর একটা রূপ ধারণ করে। ড্রাগানের বাগানটি দেখতে অসাধারণ লাগে।
এই বাগানে কাজ করা দিনমজুর জাকির হোসেন বলেন, শীতকাল ও কুয়াশা আচ্ছন্ন এ সময় লাইটিংয়ের তাপে ড্রাগন গাছে ফল আসে। বাগানে লাইটিং করা ফলটি খেতে খুব সুস্বাধু ও মিষ্টি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা বলেন, বর্তমানে উপজেলায় প্রায় ৮৫ হেক্টর জমিতে ড্রাগনের আবাদ হচ্ছে। অমৌসুমে উৎপাদিত ড্রাগনের বাজারমূল্য তুলনামূলক বেশি হওয়ায় কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। এর ফলে ড্রাগন আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অফিস থেকে সব সময় কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও উপকরণ বিতরণ করা হচ্ছে। সব থেকে নিরাপদ উচ্চমূল্যের ফসল সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখে চলেছে কৃষি বিভাগ। বর্তমানে অসময়ে ড্রাগন প্রাপ্তির জন্য বেশ কিছু কৃষক আটিফিসিয়াল লাইটিংয়ের ব্যবহার করছে। এর ফলে অসময়ে ড্রাগন আবাদ সম্ভব হবে এবং কৃষকরা ভালো মূল্য পাবে। এসব বাগানের ড্রাগন শার্শা উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে যশোরসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। ঢাকার কিছু ব্যবসায়ীরা এখান থেকে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন বলে তিনি জানান।