রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৪:০৬ পূর্বাহ্ন

ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী চকবাজারের ইফতার

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

রমজানের তপ্ত দুপুরে পুরান ঢাকার সরু গলিগুলো যখন আর্দ্র হতে শুরু করে, তখন চকবাজারের বাতাসে ভাসা অদ্ভুত সুবাস জানান দেয় এক অসাধারণ আয়োজনের কথা। প্রায় সাড়ে চারশ বছরের প্রাচীন এই জনপদ প্রতি বছর রমজানে নিজের খোলস ছেড়ে মুঘলাই আভিজাত্যে সেজে ওঠে। ঢাকার বিবর্তন হয়েছে অনেক, আকাশচুম্বী দালানকোঠা শহরের মানচিত্র বদলে দিয়েছে, কিন্তু চকবাজারের ইফতারের সেই আদিম আবেদন আজও অমলিন। এটি কয়েক প্রজন্মের আবেগ আর স্মৃতির এক বিশাল কোলাজ।

শাহজাহানের আমলের জৌলুস এখন আর নেই ঠিকই, তবে ১৬৭৬ সালে সুবেদার শায়েস্তা খাঁর তৈরি শাহী মসজিদ আর ১৭০২ সালে নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর হাতে আধুনিক রূপ পাওয়া এই চকবাজার আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জোহরের নামাজের পর থেকেই যখন কড়াইয়ের ছ্যাঁকছ্যাঁক শব্দ আর মসলার কড়া ঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, মনে হয় সময় যেন কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে গেছে। চারপাশের কোলাহল ছাপিয়ে ওঠে বিক্রেতাদের হাঁকডাক, ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক তৃপ্তির এক নিপুণ মেলবন্ধন ঘটে সেখানে।

চকবাজারের ইফতারের কথা উঠলেই সবার আগে যে নামটির কথা মনে আসে, তা হলো বড় বাপের পোলায় খায়। অদ্ভুত এই নামের পেছনে লুকিয়ে আছে ঢাকার নবাবী আমলের এক গভীর আভিজাত্য। খাসির মাংস, গরুর মগজ, কলিজা, মুরগির কুঁচি, ডিম, মিষ্টিকুমড়া আর চিড়াসহ প্রায় একশ রকমের উপকরণের এক নিপুণ সংমিশ্রণ এটি। পিতলের বিশাল থালায় এই সব উপাদান যখন দক্ষ হাতে মাখানো হয়, তখন তা শুধুই খাদ্য থাকে না, হয়ে ওঠে এক শিল্প। স্থানীয়দের বিশ্বাস, মোঘল আমলে শেখ চোরার ভত্তা নামে পরিচিত এই খাবারটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর নতুন নামে পরিচিতি পায়। এই খাবারটি পুরান ঢাকার মানুষের কাছে এক অহংকার, যা ছাড়া তাদের ইফতার টেবিল অপূর্ণ থেকে যায়।

বাজারের ভেতর দিয়ে হাঁটলে চোখে পড়বে থরে থরে সাজানো সুতি কাবাব। আগুনের তাপে ঝলসানো মাংসের সেই রং আর সুবাস যেকোনো ভোজনরসিককে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করবে। জালি কাবাব, টিক্কা কাবাব কিংবা শিকের ভারী কাবাবের পসরা সাজিয়ে বসেন বংশপরম্পরায় এই পেশায় যুক্ত থাকা কারিগররা। তাদের হাতের জাদুতে সাধারণ মাংস হয়ে ওঠে অমৃত। কবুতর কিংবা কোয়েলের আস্ত রোস্ট, খাসির রানের মচমচে ভাজা মিলিয়ে এক এলাহি কা-! চকবাজারের ইফতার মানে রসনাবিলাসের এক মহোৎসব। মিষ্টিজাতীয় খাবারের ক্ষেত্রেও চকবাজার পিছিয়ে নেই। বিশাল আকারের শাহী জিলাপির প্যাঁচগুলো ঐতিহ্যেরই এক প্রতিচ্ছবি। এরপর আছে জাফরানি ঘ্রাণের ফিরনি, ফালুদা আর পেস্তা বাদামের শরবত। বিশেষ করে ছানামাঠা আর নূরানি লাচ্ছির গ্লাস হাতে নিলে সারাদিনের রোজার ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে যায়। পনিরের সমাহার আর মাটির পাত্রে জমানো দইয়ের স্বাদ মুখে লেগে থাকে বহুক্ষণ।

চকবাজারের পানীয়গুলোর মধ্যে পনিরের পানি আর ডাবের পানিও বেশ জনপ্রিয়, যা দীর্ঘ উপবাসের পর শরীরকে প্রশান্তি দেয়। তবে এই বাজারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বিক্রেতারা। এদের অধিকাংশ মৌসুমি ব্যবসায়ী, যারা কেবল রমজান মাসেই নিজেদের পারিবারিক গোপন রেসিপি নিয়ে রাস্তায় নামেন। বাবা-দাদার কাছ থেকে শেখা রান্নার কৌশল তারা পরম মমতায় আগলে রেখেছেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ঢাকার আদি বাসিন্দারাও ভিড় জমান প্রিয় খাবারটি সংগ্রহ করতে। বিকেলের রোদে যখন পুরো চকবাজার এলাকায় মানুষের ঢল নামে, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একাকার হয়ে যায় খাবারের এই উৎসবে। চকবাজারের ইফতারি কেবল রসনা মেটায় না, এটি ঢাকার আদি সংস্কৃতির ধারক হিসেবে কাজ করে। ইফতারের আগ মুহূর্তে যখন আজানের অপেক্ষা চলে, রাস্তার ধারের সারিবদ্ধ দোকানগুলোতে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে।

হাজার হাজার মানুষের সমাগম থাকলেও সেই মুহূর্তটি থাকে ধ্যানের মতো শান্ত। কাগজের ঠোঙায় ইফতারি নিয়ে দ্রুত পায়ে বাড়ির পথে ছোটা মানুষের মুখে তখন থাকে তৃপ্তির আভা। এই আয়োজন শেখায় ধৈর্য আর সহমর্মিতার পাঠ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার সংস্কৃতিতে অনেক পরিবর্তন এলেও চকবাজারের ঐতিহ্য আজও তার স্বকীয়তা বজায় রেখেছে। এটি ঢাকার মানুষের আত্মার আত্মীয়। এই রমজানেও চকবাজার তার সেই পুরোনো রূপ নিয়েই হাজির হয়েছে। মোঘল আমলের রন্ধনশৈলী আর আধুনিক যুগের চাহিদার এই মেলবন্ধন যুগে যুগে টিকে থাকবে। চকবাজারের প্রতিটি লোকমা ইতিহাসের এক একটি পাতা, যা প্রতি বছর রমজানে নতুন করে উন্মোচিত হয়। ভোজনরসিকদের কাছে এই বাজার শেকড়ের টানে ফিরে আসার এক পবিত্র তীর্থস্থান।

বাজারের এই ঐতিহ্যের শেকড় কত গভীরে, তা উঠে আসে এক প্রবীণ বিক্রেতার কথায়। দৈনিক রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘আমাদের এই বাজারে ইফতারি বিক্রি করা শুধু ব্যবসার বিষয় না, এটা আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা এক সম্মান। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ যখন আমাদের হাতের ইফতার নিতে আসে, তখন মনে হয় আমরা ঢাকার আসল পরিচয়টা ধরে রেখেছি। দাম বড় কথা না, মানুষের মুখে তৃপ্তিটাই আমাদের সার্থকতা।’

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102