ভুয়া বিল ভাউচার ও নিয়োগ বাণিজ্যে কয়েক কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজের অধ্যক্ষ আহমেদ শফিকের বিরুদ্ধে। তদন্ত ও অডিট কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আট মাসেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি আওয়ামী লীগ নেতা শফিকের বিরুদ্ধে। বহাল তবিয়তে থেকে দম্ভ করেই চালিয়ে যাচ্ছেন সকল কার্যক্রম। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে বাহিরে চলছে নানা সমালোচনা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নাসিরাবাদ কলেজের অধ্যক্ষ, স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ জেলা শাখার সভাপতি ও মহানগর আওয়ামী লীগের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আহমেদ শফিকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তার অপসারণ দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। তার অনিয়ম দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে ওই বছরের ৭ অক্টোবর অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার তাহমিনা আক্তারকে প্রধান করে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করেন তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার উম্মে সালমা তানজিয়া।
তদন্ত কমিটি দীর্ঘ এক মাস তদন্ত করে আহমেদ শফিকের বিরুদ্ধে ভুয়া বিল ভাউচারে মাসের পর মাস টাকা উত্তোলন, কলেজ ফান্ডের আড়াই কোটি টাকা হাতে নগদ ও নিয়োগে স্বজনপ্রীতি এবং বাণিজ্যের প্রমাণ পান। নিয়ম-নীতির তুয়াক্কা না করে আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে তিনি এসব করেন।
পরে কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও বিভাগীয় কমিশনার উম্মে সালমা তানজিয়া ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান আকন্দকে প্রধান করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট অভ্যন্তরীন নিরীক্ষা (অডিট) কমিটি গঠন করে দেন।
এই কমিটি ২০১২-২০১৩ হতে ২০২৩-২০২৪ মোট ১২টি অর্থ বছরের অডিট কার্যক্রম সম্পন্ন করে ব্যাপক অনিয়ম পান।
২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরে ২৬টি বিলে ৬ লাখ ৩০ হাজার ৮৮০টাকা উত্তোলনে অধ্যক্ষের একক স্বাক্ষর, ভুয়া ভাউচার এবং নিয়মের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা উত্তোলনের সত্যতা পান।
একই ভাবে ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে ১১টি বিলে ৬ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬৩ টাকা উত্তোলন। ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে ২৫টি বিলে ১১লাখ ৮১ হাজার ৭৫১ টাকা উত্তোলন করা হয়। বাকি অর্থবছরগুলোতেও একই ভাবে অধিকাংশ বিল উত্তোলন করা হয়েছে জানিয়ে চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল প্রতিবেদন জমাদেন অডিট কমিটি। এখনও পর্যন্ত নেওয়া হয়নি কোনো ধরনের ব্যবস্থা।
চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলী কলেজটির গভর্নিং বডির সভাপতি নির্বাচিত হন। অডিট কমিটির রিপোর্টের সত্যতা যাচাইয়ে আবারও তিন সদস্য কমিটি গঠন করেন তিনি। সেই কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হলেও এখনো পর্যন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি।
নগরের সেনবাড়ি এলাকায় ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত নাসিরাবাদ কলেজের শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫ হাজারের অধিক। শিক্ষক স্টাফ রয়েছেন ১২০ জনের মতো। ২০১৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি থেকে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন আহমেদ শফিক।
তদন্ত কমিটির ছাত্র প্রতিনিধি ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সামনের সারি থেকে নেতৃত্ব দেওয়া গকুল সূত্রধর মানিক বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দুর্নীতির অভিযোগ এনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ অধ্যক্ষ আহমেদ শফিকের অপসারণ দাবিতে মব সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কলেজের সম্মানের দিকে তাকিয়ে আমরা তা হতে দেয়নি। চেয়েছি আইনি প্রক্রিয়ায় সবকিছু সম্পন্ন হোক। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যখন কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি সামনে এসেছে তা আমরা তুলে ধরে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে তিনি বীরদর্পে সব দুর্নীতি করেছেন।
কিন্তু রহস্যজনক কারণে এ বিষয়টি নিয়ে এখন সবাই চুপ। অডিটের একটি হিসেবে দেখা গেছে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তিনি ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা নগদ হাতে রেখেছিলেন। পরে তা ব্যয়ের কোনো হিসেব পাওয়া যায়নি। আমাদের স্বচ্ছ প্রতিবেদনের পর আর কিছু থাকে না। দেড় বছর হয়ে গেলেও তিনি বহাল তবিয়তে যা হাস্যকর।
অডিট কমিটির প্রধান ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান আকন্দ বলেন, দীর্ঘ তদন্তের পর আমরা বিস্তারিত তুলে ধরে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এখন কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নিলে তা নিয়ে আমার কথা বলার সুযোগ নেই। কারণ আমি একই প্রতিষ্ঠানে তাদের অধীনে চাকরি করি।
বিভাগীয় কমিশনারের তদন্ত কমিটি গঠনে কোনো এখতিয়ার নেই জানিয়ে অভিযুক্ত নাসিরাবাদ কলেজের অধ্যক্ষ আহমেদ শফিক বলেন, আমি কোনো তদন্ত প্রতিবেদন পাইনি। এ ব্যাপারে আমি দুটি পত্রিকায় প্রতিবাদ ছাপিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে এ নিয়ে আপনাদেরও কোনো কথা বলার সুযোগ নেই। আমার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দেখছে। মনে রাখবেন, আমি ভাষা সৈনিকের সন্তান। কলেজকে কোটি কোটি টাকার ফান্ড তৈরি করে দিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, আমার বিরুদ্ধে ১৪ টি অভিযোগ আনা হয়েছে। আমি ৫৭৩ পৃষ্ঠায় লিখিত প্রমাণ দিয়েছি এবং সাড়ে ১৪ পৃষ্ঠার জবাব দিয়েছি। প্রতিবছরই সবকিছুর অডিট হয়েছে; এখানে অনিয়ম করার কোনো সুযোগ নেই। নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, স্বচ্ছতার সহিত সবাইকে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। কারো কাছ থেকে এক কাপ চাও খাওয়া হয়নি।
গভর্নিং বডির সভাপতি অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলী বলেন, বিভাগীয় কমিশনারের অডিট কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সেটি চেক করার জন্য গভর্নিং বডি থেকে ৩ সদস্যের একটি কমিটির গঠন করে হয়েছে। তিন মাসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। তিন মাস হয়েও গেছে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই। তাহলে দায় আমার ওপরেই আসবে।