শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:০৫ পূর্বাহ্ন

ভারত–বাংলাদেশের সম্পর্ক ফের কেন তলানিতে?

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫

ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর যে কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক নিরাপত্তা ঘটনা, পারস্পরিক অভিযোগ এবং প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্য সেই দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম স্থগিত, উভয় দেশের মিশনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক তলব—এসব ঘটনায় স্পষ্ট যে সম্পর্ক এখন কেবল নীতিগত মতপার্থক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আস্থার গভীর সংকটে রূপ নিয়েছে।

নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ ঘিরে ভারত ও বাংলাদেশের ব্যাখ্যা একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ভারত বলছে, এটি ছিল সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত প্রতিবাদ; ঢাকা বলছে, কূটনৈতিক এলাকার গভীরে প্রবেশ, হুমকি ও অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতির লঙ্ঘন।

ঢাকার দৃষ্টিতে, এ ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভ নয়; বরং এটি ভারতের সদিচ্ছা ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। অন্যদিকে, ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সহিংসতা ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামনে এনে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ড সম্পর্কের অবনতিতে একটি মোড় বদলের মুহূর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। হত্যার সঙ্গে ভারত পলায়নের অভিযোগ ওঠায় ঘটনাটি দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনায় রূপ নেয়।

যদিও ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, যৌথ তদন্ত বা সমন্বিত যোগাযোগের অভাব সন্দেহ ও গুজবকে উসকে দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ভারত-সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান ও কূটনৈতিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে বিক্ষোভ ও হামলা সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। ভারতের চোখে এগুলো কেবল রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা নয়; বরং সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিবেশের অবনতি।

ভারতের উদ্বেগের শিকড় ইতিহাসে। ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বাংলাদেশে আশ্রয় পাওয়ার অভিজ্ঞতা দিল্লির কৌশলগত স্মৃতিতে গভীরভাবে গেঁথে আছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে সেই অধ্যায়ের অবসান ঘটে—বিদ্রোহী ঘাঁটি ভেঙে দেওয়া হয়, শীর্ষ নেতাদের হস্তান্তর করা হয় এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়।

হাসিনার পতনের পর সেই কাঠামো ভেঙে পড়বে কি না—এই আশঙ্কাই দিল্লির মূল দুশ্চিন্তা। অন্তর্বর্তী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিলেও রাজনৈতিক বক্তব্য ও জনমতের ভাষা ভারতের কাছে অস্বস্তিকর।

এদিকে বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন ঘিরে ভারতবিরোধী বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হয়ে উঠছে। এটি জাতীয়তাবাদ প্রদর্শনের সহজ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যদিও বাস্তবে এই বক্তব্যগুলোর বাস্তবায়নযোগ্যতা সীমিত।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে বাংলাদেশি রাজনৈতিক নেতাদের মন্তব্য দিল্লিতে বিশেষভাবে সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, বিশেষ করে মণিপুরসহ অঞ্চলের বর্তমান অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে। ভারতের দৃষ্টিতে, সীমান্ত পারের যেকোনো ইঙ্গিতপূর্ণ হস্তক্ষেপ গভীর উদ্বেগের কারণ।

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পরিক নির্ভরতা এখনো অটুট। বাণিজ্য, সংযোগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা—সব ক্ষেত্রেই সম্পর্কের ভাঙন উভয় পক্ষের জন্যই ব্যয়বহুল।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আস্থার ঘাটতি, প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ এবং সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগের অভাব সেই বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। নিম্ন আস্থার এই পরিবেশে রাজনৈতিক অভিনেতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষ্য সম্পর্ককে আরও কঠিন করে তুলছে।

স্বল্পমেয়াদে সম্পর্কের দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা সীমিত। উভয় পক্ষই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও নিরাপত্তা উদ্বেগে আবদ্ধ। তবে দীর্ঘমেয়াদে, বাস্তববাদী কূটনীতি ও নীরব নিরাপত্তা সহযোগিতাই সম্পর্ক পুনর্গঠনের একমাত্র পথ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102