বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:৩৮ অপরাহ্ন

ইউরোফাইটার টাইফুন কী, কেন কিনছে বাংলাদেশ?

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫

বাংলাদেশ বিমান বাহিনী (বিএএফ) তাদের বহর আধুনিকায়নের পথে একটি বড় ও কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছে। অত্যাধুনিক মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান ইউরোফাইটার টাইফুন কেনার লক্ষ্যে ইতালির প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লিওনার্দো এসপিএ-এর সঙ্গে একটি লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) বা সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেছে বিমান বাহিনী।

গত মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) বিমান বাহিনীর সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল আহসানসহ দুই দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা।

যদিও এই সম্মতিপত্রে কতটি যুদ্ধবিমান কেনা হবে, কনফিগারেশন কেমন হবে কিংবা মোট ব্যয় কত- এসব বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এটিকে বিমান বাহিনীর ইতিহাসে অন্যতম উচ্চাভিলাষী আধুনিকায়ন উদ্যোগ হিসেবে দেখছে।

ফোর্সেস গোল ২০৩০

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোফাইটার টাইফুন নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়া ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আওতায় বিমান বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি আধুনিকায়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন ধরে চীন ও রাশিয়ার তৈরি যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে ইউরোপীয় প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝোঁকার ইঙ্গিত দিচ্ছে এই এলওআই।

বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত মনে করেন, ‘ইউরোফাইটার কেনা বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষায় বড় অগ্রগতি আনবে। এতে কেবল সামরিক নয়, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সুবিধাও মিলবে।’

তার ভাষায়, ‘টাইফুন যুক্ত হলে বিমান বাহিনীর প্রতিরোধক্ষমতা আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশকে একটি সক্ষম আকাশশক্তি হিসেবে তুলে ধরবে।’

টাইফুন কী ধরনের যুদ্ধবিমান?

ইউরোফাইটার টাইফুন বিশ্বের অন্যতম সক্ষম ৪.৫ প্রজন্মের মাল্টিরোল ফাইটার জেট। এটি যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি ও স্পেনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি একটি ইউরোপীয় প্ল্যাটফর্ম। বর্তমানে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, অস্ট্রিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান ও কাতারের বিমান বাহিনীতে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।

দুটি ইজে-২০০ টার্বোফ্যান ইঞ্জিন চালিত এই যুদ্ধবিমান ঘণ্টায় প্রায় ২ মাখ (প্রায় ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার) গতিতে উড়তে পারে এবং সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার ফুট (কিছু কনফিগারেশনে আরও বেশি) উচ্চতায় কার্যক্রম চালাতে সক্ষম। ডেল্টা-ক্যানার্ড ডিজাইন ও ফ্লাই-বাই-ওয়্যার কন্ট্রোল সিস্টেমের কারণে এটি দ্রুত ম্যানুভার করতে পারে, যা আকাশযুদ্ধে বড় সুবিধা।

টাইফুনে রয়েছে আধুনিক এএসইএ (এইএসএ) রাডার, পাইরেট ইনফ্রারেড ট্র্যাকিং সিস্টেম, এবং শক্তিশালী প্রেটরিয়ান ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ডিফেন্স সিস্টেম। এগুলোর সমন্বয়ে এটি দূরপাল্লা থেকে একাধিক শত্রু লক্ষ্য শনাক্ত, ট্র্যাক ও মোকাবিলা করতে পারে, একই সঙ্গে নিজেকে রাডার ও মিসাইল হুমকি থেকে সুরক্ষিত রাখে।

আকাশ থেকে আকাশে যুদ্ধের পাশাপাশি এটি এয়ার-টু-গ্রাউন্ড, অ্যান্টিশিপ, প্রিসিশন স্ট্রাইক এবং রিয়েল-টাইম ব্যাটেলফিল্ড ডেটা প্রসেসিং মিশনেও সক্ষম।

কেন টাইফুনের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ?

বর্তমানে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধান যুদ্ধবিমান বহর গঠিত পুরোনো এফ-৭, সীমিত সংখ্যক মিগ-২৯ এবং প্রশিক্ষণ ও লাইট অ্যাটাক বিমানের ওপর। এসব প্ল্যাটফর্ম আধুনিক আকাশযুদ্ধ, দূরপাল্লার সেন্সর ও নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধক্ষেত্রে ক্রমেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে- ভারতের রাফাল সংযোজন, পাকিস্তানের জেএফ-১৭ উন্নয়ন এবং মিয়ানমারের বিমান বাহিনী আধুনিকায়নের প্রেক্ষিতে- বাংলাদেশের জন্য আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা কৌশলগত প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।

টাইফুন যুক্ত হলে জাতীয় আকাশসীমায় হুমকি আসার আগেই তা শনাক্ত ও প্রতিহত করার সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বাণিজ্য রুট সুরক্ষায় বিমান বাহিনীর ভূমিকা আরও বিস্তৃত হবে।

রাফায়েল ও জে-১০সি’র সঙ্গে তুলনায় টাইফুন

বিশ্লেষকেরা সাধারণত টাইফুন ও ফরাসি রাফালকে কাছাকাছি ক্ষমতার যুদ্ধবিমান হিসেবেই দেখেন। তবে টাইফুন দ্রুতগতি, উচ্চতাভিত্তিক আকাশযুদ্ধ এবং ম্যানুভারেবিলিটিতে এগিয়ে, আর রাফায়েল অপেক্ষাকৃত কম জ্বালানিতে ভারী অস্ত্র বহনে সুবিধাজনক।

চীনের জে-১০সি তুলনামূলকভাবে সস্তা হলেও, এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট হওয়ায় টাইফুনের মতো দ্রুতগতিতে উচ্চতায় ওঠা ও গতি ধরে রেখে ম্যানুভার করার সক্ষমতা নেই। তবে খরচ ও রক্ষণাবেক্ষণের দিক থেকে জে-১০সি অনেক বেশি সাশ্রয়ী।

ব্যয় ও সহযোগিতা

সূত্র অনুযায়ী, কনফিগারেশনের ওপর নির্ভর করে একটি ইউরোফাইটার টাইফুনের দাম ৯০ থেকে ১২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা তার বেশি হতে পারে। এর সঙ্গে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র প্যাকেজ, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা যুক্ত হলে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

ইতালির পক্ষ থেকে এমআরও (রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা), পাইলট ও টেকনিশিয়ান প্রশিক্ষণ এবং সম্ভাব্য প্রযুক্তি সহযোগিতার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনের ওপর।

কৌশলগত বার্তা

ইউরোফাইটার টাইফুনে আগ্রহ কেবল একটি যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ নয়; এটি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতিতে একটি স্পষ্ট কৌশলগত বার্তা। ইউরোপীয় প্ল্যাটফর্মে ঝোঁকার মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে একক দেশনির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চাইছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চূড়ান্ত চুক্তি হলে এটি বিমান বাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে এবং দক্ষিণ এশিয়ার আকাশশক্তির মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102