প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা শুরু হয়েছে। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় বাংলাদেশ সচিবালয়ের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে এ বৈঠক শুরু হয়।
সভায় ঢাকার গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত প্রস্তাবিত এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন) প্রকল্পটি কার্যতালিকায় রাখা হয়েছে। দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থায় বৈদ্যুতিক ট্রেনভিত্তিক এই মেট্রোরেল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ মুহূর্তে প্রকল্পটির অনুমোদন স্থগিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পটির প্রস্তুতিমূলক কাজের বড় অংশ সম্পন্ন হওয়ায় একনেকের অনুমোদনের জন্য এটি উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এ জন্য প্রয়োজনীয় উপস্থাপনাও প্রস্তুত করা হয়। তবে বৈঠকের আগে প্রকল্পটি অনুমোদনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।
সূত্রের দাবি, এমআরটি-৫-এর আগে উন্নয়ন সহযোগী একটি দেশের অর্থায়নে বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় থাকা আরও দুটি মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়টি অগ্রাধিকার পেতে পারে। একই সঙ্গে এমআরটি-৫-এর পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অনিয়মের অভিযোগও এসেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, গাবতলী থেকে শুরু হয়ে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কাওরান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও ও আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাবে এই মেট্রোরেল। পুরো রুটে যাতায়াতে সময় লাগবে আনুমানিক ২৮ মিনিট। ব্যস্ত সময়ে প্রতি ৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড পরপর ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী, রুটটির মোট দৈর্ঘ্য ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে ভূগর্ভস্থ এবং ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার উড়ালপথে। পুরো রুটে থাকবে ১৫টি স্টেশন—এর মধ্যে ১১টি পাতাল ও চারটি উড়াল স্টেশন।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে গড়ে ব্যয় পড়ছে প্রায় ২ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। প্রকল্পের বড় অংশ ভূগর্ভস্থ হওয়ায় নির্মাণ ব্যয় তুলনামূলক বেশি হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে ছয়টি কোচ নিয়ে ১৯টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ট্রেনে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯০৮ জন যাত্রী পরিবহণ করতে পারবেন। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) হিসাব অনুযায়ী, রুটটি চালু হলে প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী এতে যাতায়াত করতে পারবেন।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান কবির আহামদ বলেন, ঢাকার যানজট নিরসনে মেট্রোরেলের বিকল্প নেই। ধাপে ধাপে সব মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজন রয়েছে। তবে সব রুট চালু হলে এর সুফল আরও কার্যকরভাবে পাওয়া যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এমআরটি-৫ প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে এর আগে একাধিকবার পর্যালোচনা করা হয়েছে। আগের সরকারের সময়ে প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৪ হাজার ৬১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকল্পটি পুনর্মূল্যায়ন করে বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমানো হয়। সর্বশেষ প্রস্তাবে ব্যয় কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
অর্থাৎ আগের প্রাক্কলনের তুলনায় প্রকল্প ব্যয় কমেছে ৯ হাজার ১১৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা, যা প্রায় ১৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
তবে এই কমানোর পুরোটা সরাসরি প্রকৃত ব্যয় সাশ্রয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। বিদেশি ঋণের সুদ ও কমিটমেন্ট চার্জের মতো কিছু আর্থিক দায় প্রকল্প ব্যয়ের হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর পরিশোধযোগ্য সুদ ও কমিটমেন্ট চার্জ বাবদ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা প্রকল্প ব্যয়ের বাইরে রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় অর্থ বিভাগ এসব অর্থ পরিশোধ করবে। ফলে প্রকল্পের হিসাবের অঙ্ক কমলেও সরকারের ওপর থেকে ওই দায় পুরোপুরি বাদ যাচ্ছে না।
গত ১৬ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা সভায়ও প্রকল্পের ব্যয় পুনর্নির্ধারণ করা হয়। তখন ৪৭ হাজার ৬৩৪ কোটি ৮১ লাখ টাকার প্রস্তাব থেকে ২ হাজার ১৩১ কোটি ৪ লাখ টাকা কমানো হয়। পরবর্তীতে সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়।
ব্যয় কমানোর অংশ হিসেবে ঋণের সুদ ও কমিটমেন্ট চার্জের পাশাপাশি জমি অধিগ্রহণ, যানবাহন, পরামর্শক, সম্মানি এবং প্রশাসনিক ব্যয়সহ বিভিন্ন খাত পর্যালোচনা করা হয়েছে। জমির প্রয়োজনীয়তাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। শুরুতে ২৩ দশমিক ০৯ হেক্টর জমির প্রয়োজন ধরা হলেও সংশোধিত হিসাবে প্রয়োজন হবে ৯ দশমিক ১০৪ হেক্টর। এতে জমি অধিগ্রহণ ব্যয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা কমবে।
তবে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য প্রকল্পে ৪ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ফলে জমি অধিগ্রহণের পরিমাণ কমলেও পুনর্বাসন খাতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটির অর্থায়নে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা বৈদেশিক ঋণ হিসেবে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ অর্থের সম্ভাব্য উৎস এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ)।
এডিবি সর্বোচ্চ ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়া সর্বোচ্চ ১৫০ কোটি ডলার ঋণের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রকল্পের অগ্রগতি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে এসব ঋণের অর্থ ছাড় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়কাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত। এরই মধ্যে এডিবির কারিগরি সহায়তায় প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, মৌলিক ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন, দরপত্র প্রক্রিয়ায় সহায়তা এবং জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন পরিকল্পনার কাজ শেষ হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকল্পটির ব্যয় ও বাস্তবায়ন কাঠামো পর্যালোচনার পর বর্তমান প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। একনেকের অনুমোদন মিললে এরপর অর্থায়ন চুক্তি, জমি অধিগ্রহণ এবং ঠিকাদার নিয়োগসহ বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ শুরু হবে। এর মাধ্যমে আগের সরকারের সময়ে নেওয়া এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পটি নতুন সরকারের সময়ে বাস্তবায়নের পরবর্তী পর্যায়ে প্রবেশ করবে।