ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে একটি পরীক্ষামূলক ‘স্মার্ট ড্রাগ’-এর আশাব্যঞ্জক ফল, যা ক্যানসার কোষের আত্মগোপনের কৌশল ভেঙে দিয়ে ইমিউনোথেরাপিকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে। প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, ওষুধটি কিছু রোগীর ক্ষেত্রে টিউমারের আকার কমপক্ষে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সক্ষম হয়েছে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ক্যানসার কোষ অনেক সময় শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে নিজেকে আড়ালে রাখতে পারে। নতুন এই ওষুধ সেই সুরক্ষা-কবচ নষ্ট করে দেয়, ফলে ইমিউন সিস্টেম সহজেই ক্যানসার কোষ শনাক্ত করে আক্রমণ চালাতে পারে।
ছয় ধরনের ক্যানসারে আশাব্যঞ্জক ফল
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন ও অস্ট্রেলিয়ায় পরিচালিত একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে মোট ৮৩ জন রোগী অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে জরায়ু, মূত্রথলি, লিভার, অন্ত্র, ফুসফুস এবং মাথা-ঘাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীরা ছিলেন।
তাদের পরীক্ষামূলক ওষুধ জিআরডব্লিউডি৫৭৬৯ দেওয়া হয়, যা ইমিউনোথেরাপির ওষুধ সেমিপ্লিম্যাবের সঙ্গে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ২৬ জন রোগীর টিউমারের আকার কমেছে। এর মধ্যে ১৫ জনের ক্ষেত্রে টিউমার অন্তত ৩০ শতাংশ সঙ্কুচিত হয়েছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া রোগীদের সবাই পূর্ববর্তী প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে প্রত্যাশিত সাড়া পাননি। অনেকের জন্য বিকল্প চিকিৎসার সুযোগও প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যেসব রোগীর ক্ষেত্রে আগে ইমিউনোথেরাপি কার্যকর হয়নি অথবা কিছু সময় পর এর কার্যকারিতা কমে গিয়েছিল, তাদের মধ্যেও নতুন ওষুধটি ইতিবাচক ফল দেখিয়েছে।
কীভাবে কাজ করে নতুন প্রযুক্তি
বিজ্ঞানীরা জানান, ক্যানসার কোষ ইআরএপি১ (এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম অ্যামিনোপেপটিডেজ-১) নামের একটি এনজাইমের কার্যক্রম বদলে নিজেদের ইমিউন সিস্টেমের নজরের বাইরে রাখতে পারে। নতুন ওষুধটি এই এনজাইমকে বাধাগ্রস্ত করে, যার ফলে ক্যানসার কোষের আড়াল করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। তখন শরীরের টি-সেলগুলো সহজেই এসব কোষ শনাক্ত করে ধ্বংস করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন
গবেষণার নেতৃত্বদানকারী প্রফেসর ফিওনা থিস্টলথওয়েট বলেন, এটি মুখে সেবনযোগ্য ওষুধ হওয়ায় রোগীদের জন্য ব্যবহার সহজ। পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষায় যে ফল পাওয়া গেছে, তা যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক।
অন্যদিকে প্রফেসর স্টেফান সিমেওনাইডস এই গবেষণাকে ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি ‘বিশেষ অগ্রগতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গবেষণাটি এখনও প্রাথমিক ধাপে রয়েছে। তবে একাধিক ধরনের কঠিন ক্যানসারে একই সঙ্গে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা।
গবেষকরা জানিয়েছেন, ওষুধটির আরও বিস্তৃত পরিসরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। ভবিষ্যতের গবেষণাগুলো সফল হলে এটি ইমিউনোথেরাপির কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে বহু ক্যানসার রোগীর চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান