বর্তমানে রংপুর অঞ্চলের মাঠে বোরো ধান ও ভুট্টা কাটার শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে। পাশাপাশি কাটা ফসল শুকিয়ে ঘরে তোলার কাজেও ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। কিন্তু তাপপ্রবাহের কারণে কৃষিকাজে দেখা দিয়েছে ধীরগতি।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা চাঁপারতল গ্রামের কৃষিশ্রমিক এন্তাজ আলী বলেন, আমাদের এলাকায় কয়েকদিন আগেও টানা বৃষ্টির কারণে মাঠে নামতে পারিনি। এখন বৃষ্টি নেই, কিন্তু গত পাঁচ দিন ধরে এমন গরম পড়েছে যে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। মাঠে টানা এক ঘণ্টা কাজ করলেই শরীর জ্বলে ওঠে। বাধ্য হয়ে গাছের নিচে গিয়ে বিশ্রাম নিতে হয়।
একই গ্রামের কৃষিশ্রমিক আলম মিয়া জানান, বর্তমানে ধান ও ভুট্টা কাটার মৌসুম চলছে। আমরা চুক্তিভিত্তিক জমিতে ধান ও ভুট্টা কাটার কাজ করি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ছয়জনের একটি দল দুই ঘণ্টায় এক বিঘা ধান এবং তিন ঘণ্টায় এক বিঘা ভুট্টা কাটতে পারে। কিন্তু তীব্র গরমের কারণে এখন একই কাজ করতে প্রায় তিনগুণ বেশি সময় লাগছে। ফলে আয়ও কমে গেছে। মাঠে কিছুক্ষণ কাজ করলেই ছায়ায় গিয়ে বসতে হচ্ছে।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী গ্রামের কৃষিশ্রমিক বেলাল মিয়া বলেন, তাপপ্রবাহে আমরা অস্থির হয়ে পড়েছি। সারাক্ষণ শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। চুক্তি অনুযায়ী কাজ করতে না পারায় মজুরিও কম পাচ্ছি। ঘরে পর্যাপ্ত খাবার থাকলে হয়তো এই গরমে মাঠে নামতাম না। কিন্তু সংসারের দায়ে বাধ্য হয়েই কাজ করছি। আগের তুলনায় আয় এখন অর্ধেকেরও কম।
ওই উপজেলার গড্ডিগারী গ্রামের নারী কৃষিশ্রমিক আলেয়া বেগম বলেন, তীব্র গরমের কারণে নারী শ্রমিকরা মাঠে বেশিক্ষণ কাজ করতে পারছেন না। তাই তারা বাড়িতে ধান ও ভুট্টা শুকানোর কাজ করছেন। এ কারণে অনেক কৃষক এখন দৈনিক মজুরির পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ করছেন। রোদ থাকায় ধান ও ভুট্টা শুকাতে সুবিধা হচ্ছে। কিন্তু মাঠে থাকা ফসল কাটতে গিয়ে বড় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। নারী শ্রমিকরা দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারছেন না।
সিঙ্গীমারী গ্রামের কৃষক সালাদ মিয়া বলেন, খেতের ধান পেকে গেছে। দ্রুত কেটে ঘরে তোলা প্রয়োজন। কিন্তু শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। যারা আসছেন, তারাও বেশিক্ষণ কাজ করতে পারছেন না। আমিও মাঠে গিয়ে বেশি সময় থাকতে পারছি না। তাপপ্রবাহে মানুষ তো বটেই, গবাদিপশু ও পাখিরাও ছায়া খুঁজছে। তারপরও অনেক কৃষক ও কৃষিশ্রমিক বাধ্য হয়ে মাঠে কাজ করছেন। তাদের কেউ কেউ অসুস্থও হয়ে পড়ছেন।
কালীগঞ্জের তুষভান্ডার বাজারের রিকশাচালক আছমত আলী বলেন, প্রচণ্ড গরমে মানুষ অকারণে ঘর থেকে বের হচ্ছে না। ফলে যাত্রীও কমে গেছে। গরমে রিকশা চালানোও কষ্টকর হয়ে উঠেছে। আয় আগের তুলনায় অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। এভাবে গরম চলতে থাকলে সংসার চালাতে ঋণ করতে হবে।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় রংপুরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত পাঁচ দিন ধরে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ৬ থেকে ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। গত বছরের একই সময়ে তাপমাত্রা ছিল ৩৪ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। বৃষ্টিপাত না হওয়া এবং বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকায় গরমের তীব্রতা আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। দ্রুত বৃষ্টিপাত না হলে তাপপ্রবাহের প্রভাব কৃষি উৎপাদন ও জনজীবনের ওপর আরও বাড়তে পারে।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে মাঠে এখনও ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ধান ও ভুট্টা রয়েছে। কৃষক ও কৃষিশ্রমিকরা তাপপ্রবাহ উপেক্ষা করে ফসল কাটার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তারা বেশিক্ষণ মাঠে থাকতে পারছেন না। তাই কৃষক ও শ্রমিকদের দুপুরের প্রখর রোদ এড়িয়ে কাজ করা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং প্রয়োজন ছাড়া দীর্ঘ সময় মাঠে অবস্থান না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।







