ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা ও জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন গ্রীন ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলামের বিরুদ্ধে আপ্যায়ন বিলের ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ক্যাম্পাসের সাংবাদিক ও ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময় সভার নামে আপ্যায়ন ব্যয় দেখিয়ে এসব অর্থ উত্তোলন করেছেন তিনি। তবে তার কার্যালয়ে তেমন কোনো মতবিনিময় সভাই হয়নি বলে জানিয়েছেন ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
কয়েকদিন আগে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক হারে আপ্যায়ন বিল উত্তোলনের অভিযোগ সামনে আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইবির আপ্যায়ন বাজেট ছিল ১৩ লাখ টাকা। কিন্তু প্রশাসনের অতিরিক্ত আপ্যায়ন ব্যয়ে মাত্র পাঁচ মাসেই বাজেট শূন্য হয়ে যায়। বিষয়টি সন্দেহজনক হওয়ায় গত বছরের ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন দপ্তরের নামে উত্তোলিত আপ্যায়ন বিল যাচাই-বাছাই করে দেখা যায়, ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলামের নামে এই অফিস থেকে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৩২০ টাকার বিল উত্তোলন করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে
বিলের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, অধিকাংশ আপ্যায়ন বিল তোলা হয়েছে ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে আয়োজিত বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময় সভার নামে। এর মধ্যে গত ২২ সেপ্টেম্বর ‘জুলাই বর্ষপূর্তি উদযাপন’ উপলক্ষে মতবিনিময় সভার বিল বাবদ ২২,০৫০ টাকা, ২৫ অক্টোবর সাংবাদিক ও ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা বাবদ ২২,০৫০ টাকা, এর এক সপ্তাহ পর ২ নভেম্বর তিনটি সভার জন্য ২১,৬০০ টাকা এবং একই দিনে আরও তিনটি সভার জন্য ২১,৪২০ টাকা, ১৭ নভেম্বর ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে তিনটি সভার জন্য ২২,১৪০ টাকা এবং অর্থনীতি ও জিওগ্রাফি বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় বাবদ ২২,০৫০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
এসব বিলে ক্যাম্পাসের মেইন গেটের ‘ইবি স্ন্যাকস’ দোকানের প্যাকেটপ্রতি ৩০০ টাকা মূল্যের বিরিয়ানি এবং যেসব দিনে বিরিয়ানি দেওয়া হয়নি, সেসব সভায় ঝালচত্বরের ‘অভি ক্যাফে’র ২০০ টাকা মূল্যের নাস্তার প্যাকেট দেখানো হয়েছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব দোকান থেকে মাঝেমধ্যে প্রশাসনের লোকজন খাবার নিলেও ক্যাশ মেমো নেওয়ার সময় দোকানদারের স্বাক্ষর নিয়ে একাধিক ফাঁকা মেমো সংগ্রহ করা হয়। পরে প্রয়োজনমতো সেগুলো ব্যবহার করা হয়। পরিচয় গোপন রেখে এসব দোকান থেকে প্রতিবেদক নিজেও একাধিক ফাঁকা মেমো সংগ্রহ করেছেন, যেখানে ইচ্ছেমতো খাবারের বিবরণ ও দাম বসিয়ে বিল উত্তোলনের সুযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে ঝালচত্বরের অভি ক্যাফের মালিক আলমগীর বিশ্বাসকে ছাত্র উপদেষ্টার জমা দেওয়া ২০০ টাকার নাস্তার মেমো দেখালে তিনি বলেন, ‘আমার দোকানে কোনো প্যাকেট নেই, আমি নাস্তা বানাইও না। সেখানে প্যাকেট করে নাস্তা বিক্রি করবো কীভাবে? আমি প্যাকেট নাস্তা বিক্রিও করি না। এসব বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।’
ইবি স্ন্যাকসের মালিক এনামুল কবির জানান, প্রশাসনের লোকজন তার দোকান থেকে সাধারণত খাসির বিরিয়ানি নেন, যার দাম ১৮০ টাকা। অর্ডার ছাড়া সাধারণ সময়ে ৩০০ টাকার কোনো বিরিয়ানি বিক্রি করা হয় না।
এছাড়া, কোনো মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হলে সাধারণত সভার রেজুলেশন তৈরি করার কথা থাকলেও এসব বিলের সঙ্গে কোনো রেজুলেশন কপি পাওয়া যায়নি। এসব সভার রেজুলেশন বা বিলের বিস্তারিত তথ্য চাইলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা। আবার, ভিন্ন ভিন্ন দিনে ও ভিন্ন ভিন্ন ভাউচারে বিল তোলা হলেও একই অঙ্কের (২২,০৫০ টাকা) বিল একাধিকবার উত্তোলিত হওয়ায় সন্দেহ আরও বেড়েছে। কারণ, একাধিক দিনের সভায় উপস্থিত সদস্যসংখ্যা এক হওয়া অস্বাভাবিক। এতে ধারণা করা হচ্ছে, পূর্বে সংগ্রহ করা ফাঁকা ভাউচার ভিন্ন ভিন্ন দিনে ব্যবহার করে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
এদিকে, রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে এমন কোনো মতবিনিময় সভায় অংশ নেননি। ফলে তাদের নামে উত্তোলিত বিল সম্পর্কে তারা অবগত নন।
খেলাফত ছাত্র মজলিসের সভাপতি জোনায়েদ বলেন, ‘নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে কোনো সভা হয়নি। তবে প্রক্টর অফিসে বিভিন্ন ইস্যুতে বসা হয়েছে। সেখানে সাধারণ নাস্তা যেমন লেক্সাস বিস্কুট, কলা, সিঙ্গারা, ডিম প্যাটিস দেওয়া হতো। ৩০০ টাকার বিরিয়ানি কখনো দেওয়া হয়নি।’
তালাবায়ে আরাবিয়ার সেক্রেটারি শামীম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে একবার বসা হয়েছিল। এর বাইরে কোনো মতবিনিময় সভা হয়নি। প্রক্টর অফিসে সাধারণ নাস্তা দেওয়া হতো, আর দীর্ঘ সময়ের হলে সবজি রোল। নাস্তার দাম কোনোভাবেই ৩০০ টাকা হতে পারে না।’
ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি ইসমাইল হোসেন রাহাত বলেন, ‘জুলাইয়ের পর কিছু সভা হয়েছিল সংগঠনের অনুমোদন ও বঙ্গবন্ধু চেয়ার সংক্রান্ত বিষয়ে। এর বাইরে গত এক বছরে তিনি কোনো সভায় অংশ নেননি।’
শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মাসুদ রুমি মিথুন বলেন, ‘ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে ছাত্রদলের কোনো সভা হয়নি। সেখানে একাধিক সভা বা ৩০০ টাকার খাবার খাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তাদের নামে বিল তোলা হয়েছে কীভাবে, তা তারা জানেন না।’
ইবির বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক এস এম সুইট প্রথমে বিষয়টি মনে নেই বলে জানান। পরে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জিওগ্রাফি বিভাগের ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী নোমান জানান, তারা আনুষ্ঠানিক কোনো মতবিনিময় সভা করেননি। বিভাগীয় কিছু ইস্যুতে কয়েকবার কথা হয়েছে, কিন্তু এত বড় অঙ্কের আপ্যায়ন হয়নি।