বর্তমান সময়ে বজ্রপাত একটি অন্যতম প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বজ্রপাতের সময় কেবল মানুষের জীবনই নয়, বরং ঘরের দামি ইলেকট্রনিক সরঞ্জামগুলোও থাকে চরম ঝুঁকিতে। সামান্য অসতর্কতায় মুহূর্তের মধ্যেই অকেজো হয়ে যেতে পারে আপনার এসি, টিভি, ফ্রিজ বা শখের কম্পিউটারটি।
বজ্রপাত ও কালবৈশাখী ঝড়ের মৌসুমে ঘরবাড়ির ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম নষ্ট হওয়া একটি সাধারণ সমস্যা। বিশেষ করে টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার এবং রাউটার বজ্রপাতের উচ্চ ভোল্টেজে (Power Surge) সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাতের সময় বিদ্যুতের লাইনে হঠাৎ যে উচ্চ ভোল্টেজ বা ‘পাওয়ার সার্জ’ তৈরি হয়, তা সামলানোর ক্ষমতা সাধারণ ডিভাইসের থাকে না। তাই জানমালের নিরাপত্তার পাশাপাশি ঘরবাড়ির সরঞ্জাম সুরক্ষিত রাখতে কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
১. প্লাগ খুলে রাখা সবচেয়ে নিরাপদ
বজ্রপাত শুরু হলে বা আকাশে ঘন কালো মেঘ দেখা দিলে দ্রুত সব ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সুইচ বন্ধ করে প্লাগ সকেট থেকে খুলে দিন। মনে রাখবেন, কেবল সুইচ বন্ধ রাখলেই ডিভাইস নিরাপদ থাকে না; বজ্রপাতের উচ্চ ভোল্টেজ তারের মাধ্যমে ডিভাইসে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে রাউটার, টিভি এবং ফ্রিজের প্লাগ খুলে রাখা সবথেকে বুদ্ধিমানের কাজ।
২. ইন্টারনেট ও ডিস লাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা
অনেকেই শুধু পাওয়ার ক্যাবল খুলে রাখেন, কিন্তু ইন্টারনেটের ল্যান (LAN) ক্যাবল বা ডিশের তার খুলতে ভুলে যান। বজ্রপাত অনেক সময় এই তারগুলোর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে কম্পিউটার বা টিভির মাদারবোর্ড পুড়িয়ে দেয়। তাই ঝড়ের সময় রাউটারের ইনপুট লাইন এবং টিভির ডিশ লাইন আলাদা করে রাখা উচিত।
৩. ভালো মানের আর্থিং ব্যবস্থা
বজ্রপাত থেকে ঘরকে রক্ষা করার স্থায়ী সমাধান হলো উন্নত মানের ‘আর্থিং’ ব্যবস্থা। বাড়ির মূল বিদ্যুৎ সংযোগে সঠিক গ্রাউন্ডিং বা আর্থিং থাকলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ মাটির নিচে চলে যায়, যা ভেতরের সরঞ্জামগুলোকে রক্ষা করে। পুরনো বাড়ির ক্ষেত্রে আর্থিং পরীক্ষা করে নেওয়া জরুরি।
৪. সার্জ প্রোটেক্টর ব্যবহার করা
সাধারণ মাল্টিপ্লাগের বদলে ‘সার্জ প্রোটেক্টর’ (Surge Protector) সংবলিত মাল্টিপ্লাগ ব্যবহার করুন। এগুলো হঠাৎ ভোল্টেজ বেড়ে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এছাড়া এসির ক্ষেত্রে ভালো মানের ভোল্টেজ স্ট্যাবিলাইজার ব্যবহার করা নিরাপদ।
৫. থান্ডার প্রোটেকশন সিস্টেম বা বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড
ভবনের ছাদে বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড বা লাইটনিং অ্যারেস্টার (Lightning Arrester) স্থাপন করা যেতে পারে। এটি বজ্রপাতকে সরাসরি নিজের দিকে টেনে নিয়ে নিরাপদে মাটিতে পাঠিয়ে দেয়, ফলে ভবনের ভেতরে থাকা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি সুরক্ষিত থাকে।
৬. জানালার কাছে ডিভাইস না রাখা
বজ্রপাতের সময় জানালার কাছাকাছি কোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্র বা ধাতব বস্তু রাখবেন না। জানালার কাঁচ ভেদ করে বা জানালার গ্রিল দিয়েও বিদ্যুৎ প্রবাহিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৭. এসির ব্যবহার থেকে বিরত থাকা
ঝড়-বৃষ্টির সময় এসি চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আউটডোর ইউনিটটি সাধারণত খোলা জায়গায় থাকে, যা বজ্রপাতের শিকার হতে পারে। তাই এই সময়ে এসি বন্ধ রাখাই শ্রেয়।
প্রযুক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সতর্কতা আমাদের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে। সামান্য সচেতনতাই পারে আপনার শখের ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলোকে দীর্ঘস্থায়ী ও নিরাপদ রাখতে।