জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও ঠাকুরগাঁওয়ে সংকট কাটেনি। বরং ফিলিং স্টেশন ঘিরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। নতুন দামে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিন বিক্রির ঘোষণার পরও জেলার ৩৭টি পাম্পের অধিকাংশেই প্রায় প্রতিদিনই ‘পেট্রোল-অকটেন নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলছে। যে কয়েকটি পাম্প খোলা থাকে, সেখানে তেল পেতে গ্রাহকদের লম্বা লাইনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঠাকুরগাঁও সদরের সালন্দরের কাজী পেট্রোল পাম্প, এনামুল ফিলিং স্টেশন, বাঁধন কাঁকন, চৌধুরী পাম্প, সুরমা ও রূপসী বাংলা ফিলিং স্টেশনসহ জেলার প্রায় প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে পাম্প সংশ্লিষ্টদের একটি চক্র সিরিয়াল নিয়ন্ত্রণ করছে। বাইকাররা আগের দিন বিকেল থেকে পাম্পের সামনে মোটরসাইকেল রেখে যাচ্ছেন। পরে সেই গাড়ি সারারাত পাহারার নামে চক্রের সদস্যরা ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন। এই চক্রের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। কারণ তারা প্রকাশ্যে হুমকি-ধমকি ও সন্ত্রাসী মহড়া দিয়ে চলাফেরা করে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলেও প্রশাসন শুনেও না শোনার ভান করে, দেখেও না দেখার মতো আচরণ করছে। কারণ চক্রটি রাতভর এ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। এদিকে মাঝে মাঝে অনিয়মের অভিযোগে দুই-একজনকে প্রশাসন জরিমানা করছেন, যাদের মধ্যে অধিকাংশই অসহায়, নিরীহ, সাধারণ বাইকার। এই নিয়ে কিছু ম্যাজিস্ট্রেট ও ট্যাগ অফিসার মাঝে মাঝে গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ বাইকারদের সঙ্গে প্রচণ্ড দুর্ব্যবহার করছেন এবং বাকবিতণ্ডায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে দেখা গেছে।
সালন্দরের সিংপাড়ার বাসিন্দা আলী হাসান জানান, আগের দিন ১০০ টাকা দিয়ে গাড়ি রেখেও পরের দিন বেলা ১১টার আগ পর্যন্ত তেল পাননি। সংকটের কারণে তেল শেষ হয়ে যায়। এছাড়া বিশেষ চক্রকে টাকা না দিলে আগে সিরিয়াল পাওয়া যায় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেককে খালি হাতে ফিরতে হয়।
ব্যবসায়ী সোলায়মান আলী অভিযোগ করে বলেন, আগে সিরিয়ালের জন্য ৫০ টাকা নেওয়া হলেও এখন তা ১০০ টাকা করা হয়েছে। অতিরিক্ত টাকা দিলে ফুয়েল কার্ড ছাড়াই তেল পাওয়া যায়। তার মতে, পাম্প কর্তৃপক্ষের যোগসাজশ ছাড়া এমন সিন্ডিকেট সম্ভব নয়। একটি চক্র প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০টি মোটরসাইকেল লাইনে রেখে তেল সংগ্রহ করে তা কালোবাজারে বেশি দামে বিক্রি করছে বলে দাবি করেন সালন্দরের বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম। তবে অভিযুক্ত সিন্ডিকেট সদস্য সেলিম ও সুমন দাবি করেছেন, তারা পাম্প কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় সিরিয়াল নিয়ন্ত্রণ করছেন। অন্যদিকে এনামুল পাম্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরোজ হক অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এই জ্বালানি তেলের পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে পরিবহন ও কৃষি খাতে। ট্রাক চালক হান্নান শাহ বলেন, ‘তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তার ওপর দামও বাড়তি। আমাদের তো পরিবার আছে, বাধ্য হয়েই ট্রাক ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছি।’
কৃষক হামিদুর রহমান বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ায় সেচ খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। এতে আমাদের ফসল উৎপাদনের খরচ বাড়বে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতাদের ওপর পড়বে।’
পাম্পে দায়িত্বরত ট্যাগ অফিসার ও বিসিক শিল্প নগরীর কর্মকর্তা মাশরুর হাসান বলেন, ‘জনবল ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা না থাকায় অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফুয়েল কার্ড ছাড়া তেল না দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। সাধারণ মানুষের দাবি, দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে সিন্ডিকেট বন্ধ না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’