ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। দিন দিন মশার প্রকোপ বাড়তে থাকায় সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকাই তাদের জন্য দায় হয়ে উঠেছে। এতে ক্যাম্পাসজুড়ে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ মশাবাহিত রোগের আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ বিষয়ে হল প্রশাসনকে জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে যত্রতত্র ফেলে রাখা ময়লা-আবর্জনা মশার বিস্তার ঘটাচ্ছে। সাদ্দাম হোসেন হল ও শাহ আজিজুর রহমান হলের আশপাশে, সাদ্দাম হলের সামনে থেকে জিয়ামোড় হয়ে পুকুরপাড় সংলগ্ন ড্রেন, ক্রিকেট মাঠ, ঝালচত্বরসহ বিভিন্ন জায়গায় উচ্ছিষ্ট খাবারের প্যাকেট ও অব্যবহার্য প্লাস্টিকের আবর্জনার কারণে মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ক্যাম্পাস ও হলের আশপাশের ঝোপঝাড় ও ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় মশার উপদ্রব বাড়ছে। এছাড়াও রমজান উপলক্ষে শিক্ষার্থীরা ক্রিকেট মাঠে নিয়মিত ইফতারের আয়োজন করায় পলিথিন ও প্লাস্টিকের আবর্জনার পরিমাণ বাড়লেও তা নিয়মিত পরিষ্কার করা হচ্ছে না। এসব পচনশীল আবর্জনা ও জমে থাকা পানির কারণে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ছাত্রাবাসগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিকেলের পর থেকেই আবাসিক হল, জিয়ামোড়, পুকুরপাড়, দোকানপাট ও রাস্তাঘাটে মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। রমজান মাসে অনেক শিক্ষার্থী ক্রিকেট মাঠে বসে একসঙ্গে ইফতার করেন। কিন্তু অতিরিক্ত মশার কারণে কয়েল জ্বালিয়েও স্বস্তি মিলছে না। মশার উপদ্রব বাড়লেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
জিয়া হলের শিক্ষার্থী সাহরিয়ার রশীদ নিলয় বলেন, হলে থাকা এখন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। মশার কারণে রাতে ঘুমানো তো দূরের কথা, দিনের বেলায় রুমে বসে থাকাও দায় হয়ে গেছে। ড্রেনের অব্যবস্থাপনা এবং ঝোপঝাড় পরিষ্কার না করায় মশার বিস্তার ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। মশার যন্ত্রণায় পড়ার টেবিলে মনোযোগ দিতে পারছি না। বিশেষ করে সন্ধ্যায় এবং ভোরে মশার উপদ্রব এত বেশি থাকে যে কয়েল বা অ্যারোসল স্প্রে করেও রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সাদ্দাম হোসেন হলের মানসুর আলী বলেন, আমাদের হলে মশার উপদ্রব খুব বেশি। বিশেষ করে সন্ধ্যার আগ থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মশা এত বেশি থাকে যে স্বাভাবিকভাবে বসে থাকা বা পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। মশার উপদ্রবে না ঠিকমতো ঘুমাতে পারছি, না পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া যাচ্ছে। মশার উপদ্রব থেকে বাঁচতে কয়েল বা অ্যারোসল ব্যবহার করতে হয়, যা শরীরের জন্য বেশ ক্ষতিকর। ইদানীং আবার ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। প্রশাসন যেন নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চালু করে এবং হল ও আশপাশের জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা করে।
শাহ আজিজ হলের সাজ্জাতুল্লাহ শেখ বলেন, বেশ কয়েকদিন ধরে বিকেল হলেই মশার যন্ত্রণা শুরু হয়। সারাদিন রোজা রেখে সন্ধ্যার পরে পড়তে বসলে মশার যন্ত্রণায় ঠিকমতো পড়া যায় না। খাবার খাওয়ার সময়েও মশা বিরক্ত করে। আমি তিন তলায় থাকি। বাস্তব অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, নিচতলায় মশার উপদ্রব আরও অনেক বেশি। এভাবে চলতে থাকলে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়বে। জরুরি ভিত্তিতে এর সুরাহা হওয়া উচিত।
আয়েশা সিদ্দিকা হলের আজমেরি বলেন, কিছুদিন ধরে মশার উপদ্রব আমাদের জন্য বড় বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মশার যন্ত্রণায় স্বাভাবিক কাজকর্ম, টেবিলে বসে পড়াশোনা করা কিংবা হলের বাগানে আড্ডা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সন্ধ্যার আগেই জানালা বন্ধ করে দেওয়ার পরও মশার হাত থেকে নিস্তার মিলছে না। এলার্জির রোগীদের জন্য এটি আরও বড় সমস্যা। দ্রুত হলের চারপাশের জঙ্গল পরিষ্কার করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ইবি মেডিকেলের চিকিৎসক ডা. সাহেদ জানান, মশার উপদ্রবে শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, আমরা মেডিকেলের ডাক্তার ও স্টাফরাও ভুক্তভোগী। বিকেলের পর নিচতলায় মশার যন্ত্রণায় বসে থাকাই যায় না। রোগীরাও মশার কামড় খায়, আমরাও খাই। অনেকে কয়েল ব্যবহার করেন, কিন্তু সেটিও সিগারেটের চেয়েও স্বাস্থ্যের জন্য প্রায় ৩০ গুণ বেশি ক্ষতিকর। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের প্রকোপ এখন কিছুটা কমেছে, তবে যেকোনো সময়ই শিক্ষার্থীরা এতে আক্রান্ত হতে পারে। তাই মশা নিধনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিস প্রধান এম আলাউদ্দিন বলেন, মশা নিধনের জন্য আমাদের একটি ফগার মেশিন ছিল, কিন্তু সেটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকে জানানো হয়েছে, এটি আর মেরামত করা যাবে না; নতুন মেশিন কিনতে হবে। একটি ফগার মেশিনের দাম প্রায় ২ লাখ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ছাড়া এটি সহজে কেনা সম্ভব নয়। এছাড়া বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ও বন্ধ রয়েছে। তবে আমরা ভিসি স্যার ও ট্রেজারার স্যারের সঙ্গে কথা বলে চেষ্টা করব, ক্যাম্পাস খোলার আগেই যেন এটি কেনা যায়।