রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৫:২৫ পূর্বাহ্ন

একটি পিঁড়ি, একটি কাঁচি ও ৬৬ বছরের গল্প

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি। সেই পিঁড়ির ওপর বসেই চলছে জীবনের দীর্ঘ পথচলা। হাতে পুরোনো কাঁচি আর ক্ষুর। এই সামান্য সরঞ্জাম নিয়েই টানা ৬৬ বছর ধরে মানুষের চুল-দাড়ি কেটে চলেছেন ৮৭ বছর বয়সি অকিল শীল।

সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে বাজারের চেহারা। আধুনিক সেলুন, নতুন নতুন দোকান, নানা সুবিধা সবই এসেছে। কিন্তু বদলায়নি অকিল শীলের কর্মস্থল। পুকুরপাড়ের সেই ছোট জায়গাটিই যেন তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

অকিল শীলের বাড়ি নগরকান্দা উপজেলার সদর গ্রামের চৌমুখা এলাকায়। তার পিতা হরিবদন শীল। জীবিকার তাগিদে কৈশোরেই তিনি নাপিতের পেশায় যুক্ত হন। তখন বাজারে আধুনিক সেলুনের প্রচলন ছিল না। পুকুরপাড়ে বসেই মানুষের চুল কেটে সংসার চালাতেন। সেই পথচলা আজও থামেনি।

মাঝারদিয়া বাজারে সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে। হাটের দিন সকালেই অকিল শীল এসে পুকুরপাড়ে একটি কাঠের পিঁড়ি পেতে বসেন। হাতে পুরোনো কাঁচি ও ক্ষুর। সেখানেই বসে গ্রামের মানুষের চুল-দাড়ি কেটে দেন। বয়সের ভার পড়লেও কাজের প্রতি তার আগ্রহে ভাটা পড়েনি।

সরেজমিন দেখা যায়, পুকুরপাড়ের ছোট জায়গাটিতে বসে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন তিনি। সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন কয়েকজন গ্রাহক। কেউ আবার সিরিয়াল ধরে বসে আছেন। অনেকের কাছে এটি শুধু চুল কাটার জায়গা নয়, একটি পুরোনো স্মৃতির ঠিকানা।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী মাতুব্বর বলেন, ‘আমি সেলুনে চুল কাটাই না। ছোটবেলা থেকেই অকিল শীলের কাছেই চুল কাটাই। তার হাতে চুল কাটালে আলাদা একটা ভালো লাগে।’ আরেক স্থানীয় সাইদুল বলেন, ‘ধনী-গরিব সবাই তার কাছে চুল কাটান। এখানে চুল কাটাতে যেন এক ধরনের আলাদা আনন্দ আছে।’

অকিল শীল জানান, বর্তমানে প্রতি জনের চুল কাটার জন্য তিনি ৫০ টাকা নেন। হাটের দিনে তার কাছে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন গ্রাহক আসেন। সেই সামান্য আয় দিয়েই সংসার চালানোর চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই এই কাজ করছি। তখন বাজারে সেলুন ছিল না। পুকুরপাড়ে বসেই মানুষের চুল কেটে সংসার চালিয়েছি। এখন বয়স হয়েছে, তবু কাজ না করলে মন ভালো লাগে না।’

অকিল শীলের পাঁচ ছেলেমেয়ে রয়েছে। তবে তাদের কেউই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত নন।

স্থানীয়দের মতে, মাঝারদিয়া বাজারের পুরোনো স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে অকিল শীলের এই পুকুরপাড়ের সেলুন। আধুনিকতার ভিড়েও তার এই সরল জীবিকা যেন গ্রামীণ জীবনের এক জীবন্ত ইতিহাস। হাটের দিনে এখনো পুকুরপাড়ে বসে হাতে কাঁচি ও ক্ষুর নিয়ে পুরোনো গ্রাহকদের অপেক্ষায় থাকেন তিনি। কাঁচির টুংটাং শব্দেই যেন লেখা হয়ে চলেছে তার ৬৬ বছরের জীবনের গল্প।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102