মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০১:২৬ পূর্বাহ্ন

জরিপ কি ভোট ব্যালটে প্রভাব ফেলে?

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

নির্বাচনের আগের জনমত জরিপ এখন বিশ্বের প্রায় সব গণতান্ত্রিক দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব জরিপ কখনোই সরাসরি নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে না; তবে ভোটারদের মনোভাব, ক্ষমতার পালাবদলের সম্ভাবনা এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক তাপমাত্রা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশে পরিচালিত সাম্প্রতিক জরিপগুলো বিশ্লেষণ করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের নির্বাচনি জরিপের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

 

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন-পূর্ব জরিপ একটি শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। গ্যালাপ, পিউ রিসার্চ সেন্টার, ফাইভথার্টিএইট, এবিসি নিউজ–ওয়াশিংটন পোস্টের মতো সংস্থাগুলো নিয়মিত ও পদ্ধতিগতভাবে জরিপ পরিচালনা করে থাকে।

 

২০০৮ ও ২০১২ সালের নির্বাচনে এসব জরিপ তুলনামূলকভাবে নির্ভুল পূর্বাভাস দিলেও ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত জয়ের পর জরিপের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক ভোটারের শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন কিংবা নিজের মতামত প্রকাশে অনীহা জরিপকে বিভ্রান্ত করে।

 

২০২০ সালের নির্বাচনেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে জরিপের পূর্বাভাস ও প্রকৃত ফলাফলের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। এসব অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রে একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—জরিপ প্রবণতা নির্দেশ করে, নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়।

 

ভারতে নির্বাচন-পূর্ব জরিপের বাস্তবতা আরও জটিল। বিপুল জনসংখ্যা, সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস, ভাষাগত ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য জরিপ পরিচালনাকে কঠিন করে তোলে। লোকনীতি-সিএসডিএস, ইন্ডিয়া টুডে-অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া, টাইমস নাও-ভিএমআর, এবিপি নিউজ-সিভোটের মতো সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে জরিপ পরিচালনা করছে।

 

২০১৪ ও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে অধিকাংশ জরিপ বিজেপির জয় সঠিকভাবে অনুমান করলেও আসনসংখ্যার ক্ষেত্রে বড় ধরনের তারতম্য দেখা গেছে। ভারতের অভিজ্ঞতা বলছে, জরিপ রাজনৈতিক হাওয়ার দিক নির্দেশ করতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় ভোটারই।

এই আন্তর্জাতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের ২০২৬ সালের নির্বাচন-পূর্ব জরিপগুলোকে মূল্যায়ন করতে হচ্ছে। দেশে জরিপের সংস্কৃতি তুলনামূলকভাবে নতুন ও সীমিত হলেও আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে কয়েকটি বড় জরিপ ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে।

২০২৫ সালের শেষ দিকে প্রজেকশন বিডি, আইআইএলডি ও জাগ্রান ফাউন্ডেশন ন্যারেটিভ যৌথভাবে পরিচালিত একটি বৃহৎ জরিপে দেশের ৬৪ জেলা ও প্রায় তিন শতাধিক সংসদীয় আসনের ভোটারদের মতামত নেওয়া হয়। ওই জরিপ অনুযায়ী, বিএনপি প্রায় ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ সমর্থন পায়, আর জামায়াতে ইসলামী পায় ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

 

জাতীয় নাগরিক পার্টি, ইসলামী আন্দোলনসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন এক অঙ্কের ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকে। জরিপের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—প্রায় ১৭ শতাংশ ভোটার তখনো সিদ্ধান্তহীন ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই অনিশ্চিত ভোটাররাই নির্বাচনের ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।

এ ছাড়া ইনোভিশন কনসাল্টিং পরিচালিত আরেকটি জরিপে ভোটারদের রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে মতামত নেওয়া হয়। সেখানে দেখা যায়, অর্ধেকের বেশি ভোটার মনে করেন বিএনপি সরকার গঠন করতে পারে এবং একটি বড় অংশ দলটির শীর্ষ নেতাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবে দেখছেন। একই জরিপে ভোট দিতে আগ্রহী মানুষের হার তুলনামূলকভাবে বেশি পাওয়া যায়, যা নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।

এদিকে আজ সোমবার প্রকাশিত এনআরসি, আইআইএলডি ও ইএএসডির জরিপে দেখা গেছে বিএনপি এগিয়ে।

প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, এনআরসির হিসাবে বিএনপি ২২০টি আসনে জয় পেতে পারে। জামায়াতে ইসলামী ১৬ শতাংশ সমর্থন নিয়ে ৫৭টি আসনে জয়ী হতে পারে। জাতীয় পার্টি ২ শতাংশ সমর্থন নিয়ে ৫টি আসন এবং এনসিপি ৩ শতাংশ সমর্থন নিয়ে ২টি আসনে জয় পেতে পারে।

স্বতন্ত্র ও অন্যান্য প্রার্থীরা ৩ শতাংশ সমর্থন নিয়ে ১৬টি আসনে জয়ী হতে পারেন।

তবে অনেক জরিপই যথাযথ হয় না বলে তরুণরা মনে করেন।

এনআরসি জানিয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন সাবেক ছাত্র এবং ৫ জন পিএইচডি ডিগ্রিধারী গবেষকের সমন্বয়ে এই জরিপ পরিচালিত হয়েছে। ৩০০ জন উত্তরদাতার ওপর ৪টি নির্দিষ্ট প্রশ্নের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

আইআইএলডি জরিপ অনুযায়ী, নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। এই জরিপে বিএনপি পেতে পারে ৪৪ দশমিক ১ শতাংশ ভোট এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট পেতে পারে ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট। জাতীয় পার্টির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ১ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটার।

 

এ ছাড়াও ইএএসডির জরিপ বলছে, এবারের নির্বাচনকে সামনে রেখে সংস্থাটি সাড়ে ৪১ হাজার মানুষের মতামতের ভিত্তিতে এই জরিপ প্রকাশ করেছে। তাদের হিসাবে, নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট প্রায় ২০৮টি আসনে জয়লাভ করতে পারে। আর জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের সম্ভাব্য আসন সংখ্যা ৪৬টি। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি ৩টি, অন্যান্য দল ৪টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১৭টি আসনে জয়ী হতে পারেন।

 

বাংলাদেশে যুব ভোটারদের মনোভাব বোঝার ক্ষেত্রে সানেম (SANEM) পরিচালিত জরিপও গুরুত্বপূর্ণ। জরিপে দেখা যায়, তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিএনপির প্রতি সমর্থন তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও নতুন ও বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি এবং ভবিষ্যৎ জীবনের নিরাপত্তা—এই বিষয়গুলো তরুণ ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলছে।

 

সব জরিপ মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট, বাংলাদেশের ২০২৬ সালের নির্বাচন একপাক্ষিক নয়; বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের অভিজ্ঞতার মতোই জরিপ কখনোই শেষ কথা নয়। পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক পরিবেশ, শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত এবং ‘নীরব ভোট’—সব মিলিয়ে ফলাফলে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

 

অতএব, ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের জরিপগুলোকে ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী হিসেবে নয়, বরং জনমতের একটি আয়না হিসেবে দেখা উচিত। আর সেই আয়নায় যে চিত্র ফুটে উঠছে, তা বলছে, ভোটের মাঠ এখনো পুরোপুরি খোলা, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে জনগণই ব্যালটের মাধ্যমে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102