জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের হত্যাকারীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটির এক আদালত। ২০২২ সালের জুলাই মাসে নির্বাচনি প্রচারের সময় শিনজো আবেকে গুলি করে হত্যা করেন তেতসুয়া ইয়ামাগামি। প্রকাশ্যে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের তিন বছরের বেশি সময় পর বুধবার (২১ জানুয়ারি) নারা শহরের একটি আদালতের বিচারক শিনিচি তানাকা তাকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় ঘোষণা করেন।
এই হত্যাকাণ্ডকে দেশটির যুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা উল্লেখ করে ইয়ামাগামির আমৃত্যু কারাদণ্ডের আবেদন জানায় প্রসিকিউটর। অপরদিকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে আদালতে ইয়ামাগামির সর্বোচ্চ ২০ বছরের সাজার চেষ্টা করেন তার আইনজীবীরা।
সাজাপ্রাপ্ত ৪৫ বছর বয়সি ইয়ামাগামি খুন ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘনসহ একাধিক অভিযোগের মুখোমুখি ছিলেন। বিচার শুরুর পর তিনি হত্যার কথা স্বীকার করলেও কয়েকটি অভিযোগ অস্বীকার করেন। জাপানের আইনি ব্যবস্থায় দোষ স্বীকার করলেও বিচার প্রক্রিয়া চলমান থাকে।
রায় ঘোষণার দিন সকালে আদালতে প্রবেশের টিকিট পেতে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়, যা মামলাটি ঘিরে জনসাধারণের ব্যাপক আগ্রহের প্রতিফলন। আদালতের বাইরে অপেক্ষমাণ এক ব্যক্তি বলেন, তিনি ইয়ামাগামির জীবন ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সত্য জানতে চান।
বিচারে উঠে আসে, ইয়ামাগামির হামলার পেছনে মূল প্রেরণা ছিল ইউনিফিকেশন চার্চের বিরুদ্ধে জনদৃষ্টি আকর্ষণ করা। তার দাবি, মায়ের অতিরিক্ত অনুদানের কারণে পরিবারটি আর্থিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। প্রসিকিউটরদের মতে, ইয়ামাগামি বিশ্বাস করতেন—আবের মতো প্রভাবশালী নেতাকে হত্যা করলে চার্চটির সঙ্গে রাজনীতিবিদদের কথিত সম্পর্ক নিয়ে জনসমালোচনা শুরু হবে।
১৯৫৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতিষ্ঠিত ইউনিফিকেশন চার্চকে কেন্দ্র করে আবের হত্যার পর তদন্তে ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির একাধিক রক্ষণশীল আইনপ্রণেতার সঙ্গে সংগঠনটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের তথ্য প্রকাশ পায়। এর জেরে চারজন মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়।
ইয়ামাগামির আইনজীবীরা শাস্তি লঘু করার আবেদন জানিয়ে বলেন, তার শৈশব কেটেছে ‘ধর্মীয় নির্যাতনের’ মধ্য দিয়ে। তার বাবা আত্মহত্যা করেন, ভাইও পরে আত্মহত্যা করেন এবং পরিবারের আর্থিক সংকটে তাকে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়।
তবে প্রসিকিউটররা জানান, ২০২০ সাল থেকেই ইয়ামাগামি পরিকল্পিতভাবে আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি ও পরীক্ষার কাজ শুরু করেন, যা হামলার পূর্বপরিকল্পিত চরিত্র প্রমাণ করে।
বিশ্বের অন্যতম কঠোর বন্দুক নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও এই হত্যাকাণ্ড জাপানকে নাড়া দেয়। হামলার সময় নিরাপত্তাকর্মীরা প্রথমে গুলির শব্দ শনাক্ত করতে না পারায় আবের উদ্ধার বিলম্বিত হয়—পরবর্তী পুলিশ প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে আসে।
এই রায়ের মাধ্যমে জাপানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হলো।