কক্সবাজারের উখিয়ার ১৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মধ্যরাতে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মুহূর্তেই শত শত মানুষের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে গেছে।
আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে সাড়ে চার শতাধিক বসতঘর, একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়। শীতের হিমেল রাতে সর্বস্ব হারিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন অসহায় রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাত আনুমানিক ৩টার দিকে উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের শফিউল্লাহ কাটা এলাকার ১৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুনের সূত্রপাত। ক্যাম্পের ডি-৪ ব্লকে ব্র্যাক পরিচালিত একটি শিখন কেন্দ্রে প্রথম আগুন লাগে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। মুহূর্তের মধ্যেই দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুন পাশের শেড ও ঘরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। ঘুমন্ত মানুষ দিশাহারা হয়ে প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা, স্বেচ্ছাসেবক এবং ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিটের প্রায় ৩ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় সকাল ৬টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ততক্ষণে তিনটি ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আগুনের লেলিহান শিখায় ভস্মীভূত হয়েছে মানুষের ঘর, পোশাক, খাবার ও জীবনের শেষ সম্বলটুকু।
ক্যাম্প প্রশাসন সূত্র জানায়, অগ্নিকাণ্ডে কোনো প্রাণহানি না হলেও ৪৫০টি বসতঘর, ১০টি শিক্ষা কেন্দ্র, দুটি মসজিদ ও একটি মাদ্রাসা সম্পূর্ণভাবে পুড়ে গেছে। হঠাৎ এই বিপর্যয়ে সর্বস্ব হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন শত শত পরিবার। অনেকেই চোখের সামনে নিজের ঘর পুড়ে যেতে দেখে নির্বাক হয়ে পড়েন, নারী ও শিশুরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিটসহ মোট ১০টি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনের প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ক্যাম্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহমদ বলেন, অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার ও নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ড নতুন কোনো ঘটনা নয়। অস্থায়ী ঘরবাড়ি, ঘনবসতি ও সীমিত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে প্রায়ই এমন দুর্ঘটনা ঘটে। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর ৪ নম্বর ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ডে একটি হাসপাতাল পুড়ে যায়। এর আগের দিন, ২৫ ডিসেম্বর রাতে কুতুপালং নিবন্ধিত ক্যাম্পেও আগুনে অন্তত ১০টির বেশি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
একটির পর একটি অগ্নিকাণ্ডে নিঃস্ব হয়ে পড়া এসব মানুষ আবারও মানবিক সহায়তা ও নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় তাকিয়ে আছে—এই শীতের রাতে, এই অনিশ্চিত জীবনে।