বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:১৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
৯৩ আসনে ট্রাক প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে গণঅধিকার পরিষদ জাতিসংঘ সংস্থার সদর দপ্তর গুঁড়িয়ে দিল ইসরায়েল বিএনপিতে যোগ দিলেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী প্রস্তাবিত ২০ গ্রেডের নতুন সরকারি বেতন স্কেল দেখে নিন ইবির দুর্নীতি ও অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপির ৫৯ নেতাকে বহিষ্কার দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ২৩ বছরের কারাদণ্ড নির্বাচন ও নিরাপত্তা নিয়ে সেনাপ্রধানের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রধান উপদেষ্টার কাছে ‘নবম জাতীয় বেতন কমিশন’ প্রতিবেদন পেশ বরিশালে চূড়ান্ত লড়াইয়ে ৩৬ প্রার্থী, পেলেন প্রতীক বরাদ্দ

দায়মুক্তি কী, বাংলাদেশে কবে কারা পেয়েছে এ সুবিধা

আলোকিত স্বপ্নের বিডি
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু শব্দ আছে, যেগুলো সময় পেলেই নতুন করে আলোচনায় ফিরে আসে। ‘দায়মুক্তি’ তেমনই একটি শব্দ। কখনো রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, কখনো রাজনৈতিক বাস্তবতায়—এই শব্দটি ঘিরে বারবার প্রশ্ন উঠেছে ন্যায়বিচার, সংবিধান আর ক্ষমতার সীমা নিয়ে।

সাম্প্রতিক সময়ে গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তি দেওয়ার আলোচনা শুরু হতেই এই আলোচনা আবার সামনে এসেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, দায়মুক্তি আসলে কী, আর বাংলাদেশের ইতিহাসে কবে, কোন প্রেক্ষাপটে কারা এই সুবিধা পেয়েছে?

দায়মুক্তি কী?

আইনগতভাবে দায়মুক্তি বলতে বোঝায়—কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা বাহিনীকে নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের জন্য বিচার ও আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা। সাধারণভাবে এটি এমন পরিস্থিতি যেখানে কোনো কাজ অপরাধ হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সেই অপরাধের জন্য মামলা, তদন্ত বা শাস্তি থেকে রক্ষা করা হয়।

দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে সংসদকে বিশেষ পরিস্থিতিতে দায়মুক্তির আইন করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে এই ক্ষমতার ব্যবহার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থে সীমিত হয়ে এসেছে।

স্বাধীনতার পর প্রথম দায়মুক্তি পায় রক্ষীবাহিনী

স্বাধীনতার পরপরই দায়মুক্তির প্রথম নজির দেখা যায়। ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’ গঠন করা হয়।

কিন্তু বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, হত্যা ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ বেড়ে গেলে ১৯৭৪ সালে একটি অধ্যাদেশ সংশোধন করে রক্ষীবাহিনীর সব কর্মকাণ্ডকে আইনসংগত ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে হাইকোর্ট এই সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলানোর পর রক্ষীবাহিনী বিলুপ্ত হয় এবং দায়মুক্তির আদেশও কার্যত বাতিল হয়ে যায়।

শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড ও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের পর ২৬শে সেপ্টেম্বর জারি করা হয় ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংসদে এটি আইন হিসেবে অনুমোদিত হয়।

দীর্ঘ ২১ বছর পর, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে এই আইন বাতিল করে। এরপর এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত কয়েকজনের বিচার ও শাস্তি কার্যকর হয়।

অপারেশন ক্লিনহার্ট ও যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন

২০০৩ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় আবারও দায়মুক্তির ঘটনা ঘটে। ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ নামে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযানের সময় অংশ নেওয়া সদস্যদের জন্য সংসদে ‘যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন’ পাস করা হয়।

এই অভিযানে হেফাজতে ৪০ জনের বেশি মানুষ মারা যায় বলে গণমাধ্যমে খবর আসে। সরকার দাবি করে, অধিকাংশ মৃত্যুর কারণ ছিল হৃদরোগ। পরবর্তীতে রিট আবেদনের পর ২০১৫ সালে হাইকোর্ট এই আইনকে অবৈধ ঘোষণা করে। তবে আইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো সংসদে বাতিল হয়নি।

রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দায়মুক্তি

দায়মুক্তি শুধু রাজনৈতিক বা নিরাপত্তা ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০১০ সালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সরকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের জন্য দায়মুক্তির আইন প্রণয়ন করে।

এর ফলে কর্মকর্তাদের ওপর তদন্ত বা আইনি দায় থেকে রক্ষা করা হয়েছিল। তবে এটি নিয়েও সমালোচনা হয়েছে, কারণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রশ্নের মুখে পড়ে।

‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তির আলোচনা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর তিন দিনের মধ্যে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর থেকেই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল দাবি করেছেন, ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ভূমিকার জন্য তাদের দায়মুক্তি প্রয়োজন এবং সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে এর সুযোগ রয়েছে। তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের পর দেওয়া দায়মুক্তির সঙ্গে দেশের ভেতরের রাজনৈতিক আন্দোলনের তুলনা করা যায় না।

বিচার বনাম দায়মুক্তি

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, বিচার চাওয়ার অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। আইন করে এটি বন্ধ করা কখনোই সংবিধানসংগত নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমানও বলেন, বাংলাদেশে দায়মুক্তি বারবার রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে নেওয়া যেকোনো দায়মুক্তি ভবিষ্যতে ইতিহাসের দৃষ্টিতে প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

ইতিহাস কী বলছে?

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, দায়মুক্তির আইনগুলো কখনোই স্থায়ী হয়নি। সময়ের ব্যবধানে প্রায় সব দায়মুক্তির আইনই বাতিল বা অবৈধ ঘোষিত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বর্তমান প্রেক্ষাপটে নেওয়া যেকোনো দায়মুক্তির সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতেও একই প্রশ্নের মুখে পড়বে—ন্যায়বিচার কি তাহলে পিছিয়ে পড়বে?

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
  • © All rights reserved © 2019 alokitoswapner-bd.com - It is illegal to use this website without permission.
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102