গ্রিনল্যান্ড দ্বীপ দখলের হুমকি বন্ধ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার পর, গ্রিনল্যান্ডকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলে একের পর এক হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রোববার (৪ জানুয়ারি) মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দ্বীপ দখলের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলার দরকার নেই। ডেনিশ সাম্রাজ্যের তিনটি দেশের কোনোটিই দখলের অধিকার নেই যুক্তরাষ্ট্রের।
তার মন্তব্য এসেছে ট্রাম্পের এক সহকারীর স্ত্রী কেটি মিলারের এক্সে পোস্টের পর, যেখানে তিনি গ্রিনল্যান্ডের একটি মানচিত্রে আমেরিকার পতাকার রং ব্যবহার করে ‘সুন’ বা ‘শিগগিরই’ লিখেছেন।
ট্রাম্প বারবার গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হিসেবে অধিগ্রহণের সম্ভাবনার কথা মিডিয়ার সামনে উত্থাপন করেছেন। মূলত, গ্রিনল্যান্ডের ভৌগোলিক ও সামরিক দিক থেকে কৌশলগত অবস্থান এবং খনিজ সম্পদের কারণে ট্রাম্প বারবার অঞ্চলটি নেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন।
গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর, গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের লাগবেই বলে মন্তব্য করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। লক্ষ্য পূরণে ডেনমার্কের মালিকানাধীন আর্কটিক দ্বীপটিতে বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
ট্রাম্পের দাবি, চীন ও রাশিয়ার জাহাজ হুমকি তৈরি করছে অঞ্চলটিতে। তাই, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সুরক্ষায় গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ‘খুবই’ প্রয়োজন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, সামরিক শক্তি প্রয়োগ নয়, কূটনৈতিক পথেই সমঝোতার চেষ্টা করছেন তিনি। আর সে জন্য গ্রিনল্যান্ডবিষয়ক বিশেষ দূত নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। এই দায়িত্ব পাচ্ছেন লুইজিয়ানার গভর্নর লন্ড্রি।
কিন্তু গতকাল মাদুরোকে কূটনৈতিক পথে সমঝোতার চেষ্টা না করে আটক করার ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে বিশ্বনেতারা। একজন প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে কাপুরুষের মতো আটক করার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশের সরকারপ্রধানরা।
ট্রাম্পের এমন আচরণ যে শান্তি কিংবা সমঝোতা নয়, সেটি খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করেছে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। তাই তো, মাদুরোকে আটকের এক দিনের মধ্যেই ট্রাম্পকে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে হুমকি-ধমকি বন্ধ করতে বলেছেন তিনি।
গত বছর ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, জানি না কেন এটা ডেনমার্কের অংশ বলা হয়। ডেনমার্ক সেখানে কোনো ব্যয়ই করে না। সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই। খনিজ সম্পদ নয়, আমাদের জাতীয় সুরক্ষার জন্যই গ্রিনল্যান্ড দরকার। সেদিকে তাকালে দেখবেন, রাশিয়া আর চীনের জাহাজ চারপাশে। আমাদের নিরাপত্তার জন্য দ্বীপটি দরকার। আর তা পেতেই হবে।
ট্রাম্পের এমন পদক্ষেপ নতুন করে উস্কে দিয়েছে উত্তেজনা। তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে স্বায়ত্ত্বশাসিত গ্রিনল্যান্ডের প্রশাসন। নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার অন্য কারো নেই বলে জানিয়েছে তারা। ক্ষোভ জানিয়ে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, তাদের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ জানালে তা মেনে নেওয়া হবে না। কোপেনহেগেনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন বলেন, এটা পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য। আমাদের আঞ্চলিক অখণ্ডতা আমাদের ওপর নির্ভর করছে। কেউ আমাদের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করলে তা মেনে নেব না। সীমা অতিক্রম করছে তারা। ডেনমার্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হবে। এমন পদক্ষেপের ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে অবস্থান গ্রিনল্যান্ডের। ১৯৭৯ সাল থেকেই পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসিত আর্কটিক দ্বীপটি। ৫৭ হাজার জনসংখ্যার গ্রিনল্যান্ডের আছে বিপুল খনিজের ভাণ্ডার। যা ব্যবহার করতে পারলে চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে যুক্তরাষ্ট্রের। এ ছাড়া ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বসানোর ক্ষেত্রেও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে দ্বীপটি।